| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

সাভারের প্রথম শহীদ

রাজনীতি অপছন্দ করা ইয়ামিনের অনেক স্মৃতি মনে পড়ে বাবার

reporter
  • আপডেট টাইম: Jul ১৮, ২০২৫ ইং | ০৭:৩৬:৩২:পূর্বাহ্ন  |  ১৪৮৫৬৭২ বার পঠিত
রাজনীতি অপছন্দ করা ইয়ামিনের অনেক স্মৃতি মনে পড়ে বাবার
ছবির ক্যাপশন: শাইখ আশহাবুল ইয়ামিন। ছবি: সংগৃহীত

রিপোর্টার্স ২৪ ডেস্ক : আজ ১৮ জুলাই শুক্রবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সাভারের প্রথম শহীদ ইয়ামিনকে গুলি করে হত্যার এক বছর। গত বছরের ১৮ জুলাই ছিল বৃহস্পতিবার। আন্দোলনে সাভারসহ দেশ যখন উত্তাল, ঠিক ওই সময় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাকিজা, বাসসট্যান্ড, রেডিওকলোনী এলাকা ও জাহাঙ্গীরনগনর বিশ্ববিদ্যালয়সহ সাভারের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ।

ওই দিন বেলা ১১টায় পুলিশের পাশাপাশি ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ সরকার দলীয় অঙ্গসংগঠনের কর্মীরা পিস্তল, লাঠি, হকস্টিক ও দেশীয় অস্ত্র হাতে মহাসড়কে আন্দোলন বিরোধী শ্লোগান দিতে গেলে শুরু হয় ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া ত্রিমুখী সংঘর্ষ।

ওই দিন মহাসড়কের পাকিজা সংলগ্ন সাভার মডেল মসজিদ এলাকা ছিল রণক্ষেত্র। এভাবে সংঘর্ষ চলতে চলতে শতাধিক গুলিবিদ্ধসহ বিভিন্নভাবে আহত হয় শিক্ষার্থীসহ আন্দোলনরতরা। দেড়টার দিকে শাইখ আসহাবুল ইয়ামিন জোহরের নামাজ জামায়াতে আদায় করে খবর পান তার এক ম্যাডামের ছেলের চোখে রাবার বুলেট বিদ্ধ হয়ে আহত হয়। তখন ইয়ামিন নামাজ শেষ করে আন্দোলনে অংশগ্রহণ এবং ম্যাডামের ছেলের খোঁজ নেয়ার জন্য পাকিজা এলাকার মডেল মসজিদের সামনে পৌঁছালে পুলিশের সাঁজোয়ার ভিতর থেকে যেন আন্দোলনকারীদের পুলিশ গুলি ছুড়তে না পারেন সেজন্য তিনি সাজোঁয়ার দরজা বন্ধ করে দেন। তখন পুলিশ তার পাজরের বাম পাশে খুবই কাছ থেকে ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম, অপস অ্যান্ড ট্রাফিক) আবদুল্লাহিল কাফী, সাভার সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহিদুল ইসলাম ও সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ জামানের নেতৃত্বে গুলি করলে তিনি গুরুতর আহত হয়।

ওই সময় মুমূর্ষু অবস্থায় পুলিশের সাঁজোয়া যানে করে ঘুরানো হয় তাকে। যা কোনো মানুষ এ অমানবিক কাজ করতে পারে না। একপর্যায়ে মৃত ভেবে টেনে হিঁচড়ে ফেলে দেয়া হয় সাঁজোয়া যান থেকে। সেই দৃশ্য ভাইরাল হয় গোটা নেট দুনিয়ায়। এ ঘটনার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন শিক্ষার্থীরা।

ইয়ামিনের পুরো নাম শাইখ আশহাবুল ইয়ামিন (২৪)। তিনি রাজধানীর মিরপুরের মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন, থাকতেন এমআইএসটির ওসমানী হলের ৬১৯ নম্বর কক্ষে। বাসা সাভারের ব্যাংক টাউন আবাসিক এলাকায়। তাকে পরিবারের সদস্য ও বন্ধুরা ইয়ামিন নামেই ডাকতেন। ইয়ামিনসহ দেশব্যাপী যখন আরো শহীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে শুরু হয় শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে আন্দোলন। এ আন্দোলনে যোগ দেন শিক্ষক, অভিভাবক, রিকশাওয়ালা, সাধারণ মানুষও। শেখ হাসিনার ২০৪১ সালের ভিশন তছনছ হয়ে ভেঙ্গে পড়ে ৫ আগষ্ট পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আমরা পাই নতুন বাংলাদেশ।

কথা হয় ইয়ামিনের বাবা সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা মো: মহিউদ্দিনের সাথে। তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘এক বছর হলো আমার ছেলে শহীদ হয়েছে। ছেলের অনেক স্মৃতি মনে পড়ে। কোনটা ছেড়ে কোনটা বলব বুঝতে পারছি না।

তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে তো শহীদ, তাই আমি তাকে গোসল ছাড়াই দাফন করেছি। আপনারা সবাই আমার ছেলের জন্য দোয়া করবেন।

মহিউদ্দিন বলেন, ‘ছেলের মৃত্যুর পর ওই সময় তাকে দাফন করতে গিয়েও আমাকে নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে। প্রথমে কুষ্টিয়ায় আমার গ্রামের বাড়িতে দাফন করানোর উদ্দেশ্যে রওনা দিলে আমার আত্মীয়রা জানায়, স্থানীয় থানা পুলিশ তাদের বলেছেন, তাদের অনুমতি ছাড়া সেখানে কাউকে দাফন করা যাবে না। পরবর্তী সময়ে সাভারের তালবাগে ইয়ামিনের নানা-নানির কবরের পাশে দাফন করতে চাইলে সেই গোরস্তানের কর্তৃপক্ষ জানায়, ময়নাতদন্ত ছাড়া করতে গেলে পুলিশি ঝামেলা হবে। পরে বাধ্য হয়ে ব্যাংক টাউনের এই গোরস্তানে আমার ছেলেকে দাফন করি।’

তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের হত্যার পুরো দৃশ্যটি আপনারা সবাই দেখেছেন। একজন গুলিবিদ্ধ জীবিত মানুষকে কী কেউ এমনভাবে টেনেহিঁচড়ে রাস্তায় ফেলতে পারে? তখনো যদি আমার ছেলেকে হাসপাতালে নেয়া হতো হয়তো প্রাণ বেঁচে যেত। কিন্তু আমার মুমূর্ষু ছেলেকে চিকিৎসার সুযোগটিও দেয়নি তারা। আমার ছেলে এবং আমার পুরো পরিবার কখনোই কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম না। আমার ছেলে রাজনীতিকে পছন্দ করত না। আমার শ্বশুর একজন মুক্তিযোদ্ধা। সেই হিসেবে আমার ছেলেও একজন মুক্তিযোদ্ধার নাতি হিসেবে কোটা সুবিধা ভোগ করতে পারত, কিন্তু সে-ও চেয়েছে ছাত্রদের মধ্যে কোনো বৈষম্য না থাকুক। সে তার আহত বন্ধুদের নিয়ে খুব চিন্তিত এবং বিমর্ষ থাকত। আর সেজন্যই সে ওই দিন তার আহত বন্ধুদের বিচারের দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল। প্রতিদিনই নিয়ম করে আমার কলিজার টুকরা ইয়ামিনের সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন স্মৃতি মনে করি।’

তিনি আরো বলেন, ইয়ামিনের জন্ম ২০০১ সালের ১২ ডিসেম্বর। তিনি সাভার ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেন। মা নাসরিন সুলতানা, তিনি গৃহিণী। বোন শাইখ আশহাবুল জান্নাত, তিনি পড়ছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইয়ামিন বিতর্ক করতেন। এমআইএসটিতে বিতর্ক ক্লাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন ইয়ামিন। ইয়ামিন ছিল খুবই মেধাবী। বুয়েটে পড়ার সুযোগও পেয়েছিল। তবে গ্রামের বাড়িতে আমাদের প্রতিবেশী আবরার ফাহাদকে বুয়েটে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ক্ষোভে-দুঃখে সেখানে ভর্তি না হয়ে ইয়ামিন এমআইএসটিতে ভর্তি হয়। কারণ, সেখানে কোনো রাজনীতি নেই। স্বপ্ন ছিল ওখানেই শিক্ষক হিসেবে যোগ দেবে। সেই সব স্বপ্ন আজ বিষাদে পরিণত হয়েছে।


রিপোর্টার্স ২৪/এমবি

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪