আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি :
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একটি নতুন প্রতিবেদন ভারতে বিরুদ্ধে ট্রান্সন্যাশনাল রেপ্রেশন বা আন্তর্জাতিক নিপীড়নের অভিযোগ এনেছে, যা যুক্তরাজ্যের মাটিতে সংঘটিত হয়েছে বলে বলা হয়েছে।
গত ৩০ জুলাই প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি পার্লামেন্টের প্রভাবশালী জয়েন্ট কমিটি অন হিউম্যান রাইটস কর্তৃক প্রস্তুত এবং ট্রান্সন্যাশনাল রেপ্রেশন ইন দ্য ইউকে শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। এতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে কীভাবে বিভিন্ন বিদেশি রাষ্ট্র যুক্তরাজ্যে আশ্রয় নেওয়া রাজনৈতিক বিরোধী, অধিকারকর্মী এবং সাংবাদিকদের টার্গেট করছে, যার ফলে প্রবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে এক ধরনের ভীতিকর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে।
প্রতিবেদনটির দেশভিত্তিক তথ্যসংবলিত অংশে ভারতসহ বাহরাইন, চীন, মিশর, ইরিত্রিয়া, ইরান, পাকিস্তান, রাশিয়া, রুয়ান্ডা, সৌদি আরব, তুরস্ক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতকে যুক্তরাজ্যে ট্রান্সন্যাশনাল রেপ্রেশনের অভিযুক্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও চীন, রাশিয়া এবং ইরানকে সবচেয়ে স্পষ্ট নিপীড়ন চালানো রাষ্ট্র হিসেবে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তবুও ভারতের বিরুদ্ধেও যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ জমা পড়েছে বলে জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনের সংযোজনে দেখা যায়, যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিখ অধিকার সংগঠনগুলি যেমন শিখ ফেডারেশন (ইউকে), শিখ ফর জাস্টিস এবং আরও কয়েকটি সংগঠন লিখিতভাবে প্রমাণ পেশ করেছে, যেগুলির ভিত্তিতে ভারতকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়া প্রতিবেদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হল আন্তর্জাতিক পুলিশ ব্যবস্থা, বিশেষত ইন্টারপোলের অপব্যবহার। একটি পাদটীকায় বলা হয়েছে যে কমিটি ভারতসহ কয়েকটি দেশের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার অভিযোগ পেয়েছে। অর্থাৎ,অভিযোগ করা হয়েছে ভারত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের ব্যবস্থা অপব্যবহার করেছে।
প্রতিবেদনটি যুক্তরাজ্য সরকারের প্রতিক্রিয়া ও প্রস্তুতি নিয়েও কড়া সমালোচনা করেছে। বলা হয়েছে, ট্রান্সন্যাশনাল রেপ্রেশনের ক্রমবর্ধমান হুমকির বিষয়ে ব্রিটিশ সরকারের প্রতিক্রিয়া সঙ্গতিহীন এবং স্পষ্ট কৌশলহীন। কমিটি সরকারের প্রতি চারটি সুপারিশ করেছে—
১) ট্রান্সন্যাশনাল রেপ্রেশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংজ্ঞায়িত করে তথ্য সংগ্রহ ও পুলিশের সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা উন্নত করা,
২) ভুক্তভোগীদের জন্য একটি বহুভাষিক জাতীয় হটলাইন চালু করা,
৩) পুলিশদের প্রশিক্ষণ যথেষ্ট বাড়ানো যাতে তারা বিদেশি হস্তক্ষেপ চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়,
৪) ইন্টারপোল ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য কূটনৈতিক চাপে ব্রিটেনের প্রভাব কাজে লাগানো।
ভারত সরকার এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো জবাব দেয়নি, তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এই প্রতিবেদনকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, আমরা রিপোর্টে ভারতের যে উল্লেখ আছে তা লক্ষ্য করেছি এবং এই ভিত্তিহীন অভিযোগগুলি স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করছি। তিনি বলেন,এই দাবি-দাওয়া এসেছে অবিশ্বস্ত ও সন্দেহজনক সূত্র থেকে,যেগুলির অধিকাংশই নিষিদ্ধ সংগঠন বা ভারতের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ ইতিহাসসম্পন্ন ব্যক্তিদের সাথে জড়িত।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে ভারত সরকার একদিকে এই অভিযোগগুলোকে অস্বীকার করেছে, অন্যদিকে সূত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। তবে প্রতিবেদনটি ইতোমধ্যেই যুক্তরাজ্যে অবস্থানকারী ভারতীয় প্রবাসী সম্প্রদায় এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম