স্টাফ রিপোর্টার: মুক্তিযুদ্ধের সময় গড়ে ওঠা মানবিক চিকিৎসা উদ্যোগ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র-কে ঘিরে দখল, মব সন্ত্রাস ও ট্রাস্টি বোর্ড নিয়ে গুরুতর বিতর্ক সামনে এসেছে। প্রতিষ্ঠানের একমাত্র জীবিত প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ অভিযোগ করেছেন, পরিকল্পিতভাবে ‘মব’ সৃষ্টি করে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে এবং একটি অবৈধ ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করে প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়েছে।
১৯৭১ সালে ভারতের ত্রিপুরায় গড়ে ওঠা ‘বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল’ থেকেই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের যাত্রা শুরু। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের চিকিৎসা দিয়ে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ পরবর্তীতে দেশের অন্যতম বৃহৎ অলাভজনক স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। সাভারের মির্জানগরে এর সদর দপ্তর এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে ৪৩টি উপকেন্দ্র।
স্বাস্থ্যসেবা ছাড়াও শিক্ষা, নারী উন্নয়ন, কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ফার্মাসিউটিক্যালসসহ নানা খাতে কাজ করে প্রতিষ্ঠানটি। অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এটি স্বাধীনতা পুরস্কারও পেয়েছে।
২০২৩ সালের ১১ এপ্রিল প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মারা যাওয়ার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে দ্বন্দ্ব তীব্র হয়। অভিযোগ উঠেছে, ওই সময় থেকেই একটি পক্ষ প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা শুরু করে।
ডা. নাজিমউদ্দিনের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৪ আগস্ট অর্ধশতাধিক ব্যক্তি সাভারের মির্জানগরে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সদর দপ্তরে ঢুকে ‘মব’ সৃষ্টি করে। এ সময় তাকে ও পরিচালক ডা. মাহবুব জুবায়েরকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়।
তিনি অভিযোগ করেন, আমাকে ঘিরে ধরে জোর করে একটি লেখা লিখিয়ে সই নেওয়া হয়। সেটি স্বেচ্ছায় দেওয়া পদত্যাগ নয়।
ঘটনার ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, কয়েক ঘণ্টা ধরে তাকে ঘিরে রেখে চাপ প্রয়োগ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকলেও তারা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেননি।
ডা. নাজিমউদ্দিন দাবি করেন, সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও মানবাধিকারকর্মী শিরীন হকের নেতৃত্বে এই দখল প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ফোনে নির্দেশ দিয়ে তাকে প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
তবে এ বিষয়ে রিজওয়ানা হাসানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে একটি নতুন ট্রাস্ট দলিল তৈরি করে সাত সদস্যের একটি বোর্ড গঠন করা হয়, যেখানে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের নামও রয়েছে।
ডা. নাজিমউদ্দিনের দাবি, ট্রাস্ট আইন-১৮৮২ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠাতা ছাড়া নতুন ট্রাস্টি বোর্ড গঠন বৈধ নয়। তাঁর মতে, এটি সম্পূর্ণ বেআইনি ও প্রতিষ্ঠানের নিয়মবিরোধী।
ডা. নাজিমউদ্দিন জানান, জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মৃত্যুর পর তিনি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগে অডিট শুরু করেন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন। এতে একটি প্রভাবশালী পক্ষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং তাকে সরানোর পরিকল্পনা করে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ২০২৩ সালের আগস্টে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ডা. গিয়াস উদ্দিন আহমেদকেও ‘মব’ সৃষ্টি করে অপসারণ করা হয়। পরে তিনি দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যান। এটিকে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র দখলের প্রথম ধাপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
কথিত ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য মনজুর কাদির আহমেদ বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে পারবেন প্রতিষ্ঠানের আইন উপদেষ্টা। অন্যদিকে আইন বিভাগের কর্মকর্তা সোহেল রানা ফোনে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
বর্তমান পরিস্থিতিতে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ‘অবৈধভাবে দখলে’ রয়েছে দাবি করে ডা. নাজিমউদ্দিন সুষ্ঠু তদন্ত ও সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে সৃষ্ট সংকট দ্রুত সমাধান না হলে এর কার্যক্রম ও ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে এই বোর্ডের আরেক সদস্য সন্ধ্যা রায়ের বক্তব্য জানতে গত ২১ এপ্রিল গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সদর দপ্তরে গেলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া গত রাতে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বক্তব্য জানতে গত রাতে ফোন করা হলে তিনি তা রিসিভ করেননি। এ বিষয়ে তাঁকে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিয়েও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
রিপোর্টার্স২৪/বাবি সৌজন্যে: কালের কন্ঠ