ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: ইতিহাস কীভাবে রঙ বদলায়, তার এক চরম ও অবিশ্বাস্য নিদর্শন দেখল বিশ্ববাসী। এক সময়ের চরম শত্রু থেকে এবার পরম মিত্রে পরিণত হলো রাশিয়া এবং আফগানিস্তানের শাসক দল তালিবান। আফগানিস্তানের বর্তমান তালেবান সরকারের সাথে এবার একটি আনুষ্ঠানিক সামরিক সহযোগিতা চুক্তি সই করেছে ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া। এর ফলে তালিবান সরকারের সাথে মস্কোর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক যেমন আরও মজবুত হলো, তেমনই বিশ্বের একমাত্র দেশ হিসেবে তালিবান সরকারকে সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেয়ার তালিকায় নিজেদের অবস্থানকে এককভাবে শীর্ষে নিয়ে গেল রাশিয়া।
মস্কোতে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ফোরামে এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি চূড়ান্ত ও অনুমোদিত হয়। এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন তালিবানের প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা মহম্মদ ওমরের ছেলে তথা বর্তমান আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মোল্লা মহম্মদ ইয়াকুবসহ শীর্ষ স্তরের তালিবান নেতারা।
যদিও এই সামরিক চুক্তির সুনির্দিষ্ট শর্তাবলি বা বিস্তারিত তথ্য কোনো পক্ষই প্রকাশ্যে আনেনি, তবে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলে ইতিমধ্যেই এক নতুন জল্পনা শুরু হয়েছে। বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন উঠছে তবে কি এবার ইউক্রেন যুদ্ধে পুতিন বাহিনীকে সাহায্য করতে নিজেদের অভিজ্ঞ লড়াকু যোদ্ধা পাঠাবে তালেবান?
বিশেষ করে ২০২৪ সালে রাশিয়ার সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি করার পর উত্তর কোরিয়া যেভাবে মস্কোর সাহায্যে হাজার হাজার সেনা পাঠিয়েছিল, সেই স্মৃতি উসকেই এই জল্পনা তীব্র হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, তালেবানের সেনা পাঠানোর বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট প্রমাণ মেলেনি।
এই চুক্তির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অন্য জায়গায়। ১৯৭৯ সালে যখন তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান আক্রমণ করেছিল, তখন এই তালিবান যোদ্ধারাই (তৎকালীন আফগান মুজাহিদিন) সোভিয়েত ফোর্সের বিরুদ্ধে দীর্ঘ এক দশক ধরে রক্তক্ষয়ী গেরিলা যুদ্ধ চালিয়েছিল।
আজ সেই পুরোনো শত্রুতা ভুলে মস্কোর ফোরামে দাঁড়িয়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইয়াকুব রাশিয়ার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, রাশিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তি। আফগানিস্তান ও রাশিয়ার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং ঐতিহাসিক। আমরা এই সম্পর্ককে আরও বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পরিধি আরও বাড়াতে সক্ষম হয়েছি।
বৈঠকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির পুতিনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী তথা সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু আফগানিস্তানের ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর জারি করা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার তীব্র সমালোচনা করেন এবং আমেরিকার ব্যাংকে আটকে থাকা আফগান অর্থ অবমুক্ত করার দাবি জানান।
শোইগু স্পষ্ট ভাষায় বলেন, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে পশ্চিমা দেশগুলোর উচিত আফগানিস্তানের জব্দ করা সমস্ত সম্পদ দ্রুত ফিরিয়ে দেয়া। আফগানিস্তানে তাদের ২০ বছরের আগ্রাসনের সম্পূর্ণ দায় পশ্চিমাদেরই নিতে হবে এবং যুদ্ধ-পরবর্তী দেশ পুনর্গঠনের পুরো আর্থিক বোঝা তাদেরই বহন করতে হবে।
তবে এই বন্ধুত্বের মাঝেও আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় সক্রিয় জঙ্গি গোষ্ঠী ‘আইসিস-খোরাসান’-এর উপস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মস্কো। রাশিয়ার মতে, এই গোষ্ঠীটি পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
যদিও রাশিয়ার এই উদ্বেগকে এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন তালিবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ। তাঁর দাবি, আফগানিস্তানের মাটি থেকে আইসিসকে পুরোপুরি নির্মূল হয়েছে এবং আফগান বাহিনী সফলভাবে এদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতে দেওয়া হবে না, তাই কোনো দেশেরই আফগানিস্তানকে নিয়ে চিন্তিত হবার কারণ নেই।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তিটি মূলত ইউক্রেন যুদ্ধে সেনা পাঠানোর জন্য নয়, বরং আফগান সীমান্তে নিরাপত্তা সহযোগিতা, সামরিক সরঞ্জামের জোগান এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যেই করা হয়েছে।
কারণ তালিবান সরকার নিজের দেশেই নানাবিধ নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি রয়েছে, ফলে এই মুহূর্তে দেশের বাইরে বড় কোনো সামরিক সাহায্য পাঠানোর মতো রসদ বা সক্ষমতা তাদের নেই। তবে সোভিয়েত আমলের বৈরিতা ভুলে ক্রেমলিনে তালিবান মন্ত্রীর এই লাল গালিচা সংবর্ধনা এবং সামরিক হাত মেলানো আমেরিকার নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্বের কপালে যে নতুন চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে, তা বলাই বাহুল্য। তথ্যসূত্র: এনডিটিভি
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব