| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ, দায়িত্ব হারালেন সাব-রেজিস্ট্রার

reporter
  • আপডেট টাইম: জুন ২২, ২০২৬ ইং | ০৫:২৪:০০:পূর্বাহ্ন  |  ৪৮৪ বার পঠিত
রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ, দায়িত্ব হারালেন সাব-রেজিস্ট্রার

বেনাপোল প্রতিনিধি: যশোরের শার্শা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সরকারি খাস জমি ব্যক্তি মালিকানায় রেজিস্ট্রি, জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি এবং দলিল নিবন্ধনে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে আলোচিত সাব-রেজিস্ট্রার মো. শাহিন আলমের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঢাকা নিবন্ধন অধিদপ্তরের নির্দেশনার পর তাকে শার্শা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অতিরিক্ত দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

রোববার জেলা রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ আবু তালেব স্বাক্ষরিত এক দাপ্তরিক আদেশে বলা হয়, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং নিবন্ধন অধিদপ্তরের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে শার্শা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সাব-রেজিস্ট্রার মো. শাহিন আলমকে অবিলম্বে দায়িত্বমুক্ত করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, শার্শার গোগা ইউনিয়নের সেতাই গ্রামের ৪৪ শতক সরকারি খাস জমি ভুয়া খতিয়ান তৈরি করে ব্যক্তি মালিকানাধীন দেখিয়ে রেজিস্ট্রি করা হয়। এ কাজে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক ও কথিত সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য বুলবুল হোসেনসহ সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

জমির ক্রেতা আফসার আলী জানান, কাগজপত্রের সত্যতা যাচাই করতে না পেরে তিনি প্রায় সাড়ে ১০ লাখ টাকায় জমিটি কিনেছিলেন। পরে জানতে পারেন সেটি সরকারি খাস সম্পত্তি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শার্শা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে প্রতি সপ্তাহে গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০টি দলিল নিবন্ধিত হয়। এর মধ্যে ৪০ থেকে ৫০টি দলিলে জমির প্রকৃত শ্রেণি পরিবর্তন করে কম মূল্যে রেজিস্ট্রি করা হয়। ফলে প্রতি বছর প্রায় দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার দলিলে অনিয়মের আশঙ্কা রয়েছে এবং সরকার স্ট্যাম্প ডিউটি, নিবন্ধন ফি ও কর বাবদ বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে।

২০২৬ সালের ৬ এপ্রিল সম্পাদিত তিনটি দলিল পর্যালোচনায় মূল্য গোপনের অভিযোগ উঠে এসেছে। কবলা দলিল নং-২৩১২ অনুযায়ী বালুন্ডা মৌজার ২৫ শতক জমির মূল্য দেখানো হয় তিন লাখ ৩৩ হাজার টাকা। অথচ অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকৃত মূল্যের তুলনায় প্রায় ২৫ লাখ ৬৬ হাজার টাকা কম দেখানো হয়েছে। একইসঙ্গে বাগান শ্রেণির জমিকে ধানিজমি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

একই দিনে সম্পাদিত দানপত্র দলিল নং-২৩৬৪-এ বরুজবাগান মৌজার ১১ শতক জমির মূল্য পাঁচ লাখ টাকা দেখানো হলেও প্রকৃত মূল্যের তুলনায় প্রায় ১৭ লাখ ৮১ হাজার টাকা কম দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া জমিটির শ্রেণিও পরিবর্তন করা হয়েছে।

অন্যদিকে, কবলা দলিল নং-২২৯২-এ বুরুজবাগান মৌজার ৩ দশমিক ২৬ শতক জমির মূল্য দেখানো হয় এক লাখ ৪৭ হাজার টাকা। অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রকৃত মূল্যের তুলনায় প্রায় পাঁচ লাখ ৩০ হাজার টাকা কম দেখানো হয়েছে। এই তিনটি দলিলেই মোট ৪৮ লাখ ৭৭ হাজার টাকার মূল্য গোপনের তথ্য পাওয়া গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত প্রায় ১৫ মাসে অর্ধশতাধিক সরকারি খাস জমি ব্যক্তি মালিকানায় রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। পাশাপাশি দানপত্র, হেবা, ওয়ারিশ, বিনিময় ও ভ্রম সংশোধন দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও সরকারি ফি-এর বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী জানান, দানপত্র বা হেবা ঘোষণাপত্রের ক্ষেত্রে প্রতি শতক জমির জন্য পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়েছে। আর বিনিময় ও ভ্রম সংশোধন দলিলের ক্ষেত্রে অবৈধ লেনদেনের পরিমাণ ৫০ হাজার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে।

অভিযোগ রয়েছে, এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে গেলে একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। এমনকি তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গেও অসৌজন্যমূলক আচরণের ঘটনা ঘটেছে।

শাহিন আলম ২০২৫ সালের ৩ মার্চ ঝিকরগাছা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যোগদান করেন। পরবর্তীতে তিনি শার্শা, চৌগাছা ও বাঘারপাড়া উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্ব পান। একজন কর্মকর্তার একসঙ্গে চারটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়ের দায়িত্ব পালন নিয়েও স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন ওঠে।

এদিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং দুর্নীতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ (বিচার শাখা-৬) বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে বলে জানা গেছে।

গোগা ইউনিয়নের বাসিন্দা নুরুল হুদা বলেন, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সরকারি ফি-এর বাইরে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগও নতুন নয়। মানুষ সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেখতে চায়।

শার্শা উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আশরাফুল আলম বাবু বলেন, খাস জমি রেজিস্ট্রি ও জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মতো গুরুতর অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ছিল। শুধু দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নয়, পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে সাব-রেজিস্ট্রার শাহিন আলম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এ সময় দলিল লেখক বুলবুল হোসেনও সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহে বাধা দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

জেলা রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ আবু তালেব বলেন, শার্শা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, সরকারি খাস জমি রাষ্ট্রের সম্পদ। নির্ধারিত আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়া এসব জমি হস্তান্তরের সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রিপোর্টার্স২৪/বাবি

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪