আশিস গুপ্ত, নয়াদিল্লি : অস্ট্রেলিয়ায় দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরের প্রথম দিনেই চরম হেনস্থার মুখে পড়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বুধবার মেলবোর্নের একটি অভিজাত হোটেলে নিরাপত্তা বেষ্টনী গলে ঢুকে পড়ে উগ্র দক্ষিণপন্থী ও অভিবাসী-বিরোধী এক বিক্ষোভকারী প্রধানমন্ত্রী মোদীকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত আপত্তিকর ও বর্ণবাদী স্লোগান দেয়। এখানেই শেষ নয়, পরের দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার মেলবোর্নের মার্ভেল স্টেডিয়ামে প্রবাসী ভারতীয়দের উদ্দেশে মোদীর ভাষণ দেওয়ার কর্মসূচিটিও ব্যাহত করার চেষ্টা করে ওই একই ব্যক্তি। তবে উৎসবমুখর ভারতীয়দের বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজে তার সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং তাকে শেষ পর্যন্ত মাঠ ছাড়তে হয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও ক্লিপে দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রী মোদী যখন হোটেলের লবিতে রেড কার্পেট দিয়ে হেঁটে আসছিলেন, ঠিক তখনই ওপরের তলা থেকে তাকে লক্ষ্য করে চিৎকার করতে শুরু করে ওই বিক্ষোভকারী। অনলাইন দুনিয়ায় ‘অসপিল’ নামে পরিচিত এবং হুগো লেনন (২২) হিসেবে চিহ্নিত ওই যুবক ওপর থেকে চিৎকার করে বলতে থাকে, "মোদী দূর হটো! এটা অস্ট্রেলিয়া। আমাদের আর কোনো ভারতীয়ের প্রয়োজন নেই। আমরা কোনো অভিবাসন চাই না। এই দেশ শুধু অস্ট্রেলীয়দের জন্য।"
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পুলিশ দ্রুত লেননকে ঘিরে ফেলে এবং স্লোগান দেওয়া অবস্থাতেই তাকে প্রথম তলার বারান্দা থেকে টেনে-হিঁচড়ে সরিয়ে নিয়ে যায়।
ভিক্টোরিয়া পুলিশের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, মাঝরাতে সাড়ে বারোটা নাগাদ এক যুবক হোটেলে ঢুকে রাজনৈতিক স্লোগান দিচ্ছিল, পুলিশ কোনো ঝামেলা ছাড়াই তাকে সেখান থেকে সরিয়ে দিয়েছে। তবে অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা থাকা সত্ত্বেও লেনন কীভাবে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান জানতে পারল বা মোদীর কতটা কাছাকাছি সে পৌঁছে গিয়েছিল, সে বিষয়ে পুলিশ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
সিডনি মনিং হেরাল্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ার কিছু উগ্র দক্ষিণপন্থী ইনফ্লুয়েন্সার অনলাইনে প্রধানমন্ত্রীর সফরের সমস্ত গতিবিধির তথ্য শেয়ার করেছিল। জানা গেছে, ২২ বছর বয়সী লেনন আসলে এক ধনকুবের আবাসন ব্যবসায়ীর উত্তরাধিকারী এবং সে একটি ‘নব্য-নাৎসি’ গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত।
যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলি মেইলের প্রতিবেদন অনুসারে, গত বছর অস্ট্রেলিয়াজুড়ে হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণে অভিবাসী-বিরোধী যে ‘মার্চ ফর অস্ট্রেলিয়া’ র্যালি হয়েছিল, লেনন ছিল তার অন্যতম প্রধান সংগঠক। এই উগ্র দক্ষিণপন্থী বিক্ষোভকারীরা মূলত শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী ভাবধারায় বিশ্বাসী।
হোটেলের ঘটনার পরদিন, অর্থাৎ বৃহস্পতিবার, মেলবোর্নের মার্ভেল স্টেডিয়ামের বাইরে পূর্বপরিকল্পিতভাবে একদল অভিবাসী-বিরোধী বিক্ষোভকারী নিয়ে হাজির হয় লেনন। ওই স্টেডিয়ামেই অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজকে সঙ্গে নিয়ে প্রবাসী ভারতীয়দের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিচ্ছিলেন নরেন্দ্র মোদী।
অস্ট্রেলীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, লেনন ও তার দল স্বরাষ্ট্র দপ্তরের সদর দফতর থেকে মার্ভেল স্টেডিয়াম পর্যন্ত একটি মিছিল করে এবং সেখানে আসা ভারতীয়দের উদ্দেশ্যে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে বর্ণবাদী গালিগালাজ করে। তাদের হাতে "ভারতীয় আগ্রাসন বন্ধ করো" এবং "মোদী গো হোম" -এর মতো পোস্টার ছিল। তবে স্টেডিয়ামের ভেতরের উৎসবমুখর পরিবেশের সামনে তাদের এই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা দ্রুতই ভেস্তে যায়। স্টেডিয়ামে প্রবেশ করতে থাকা ভারতীয় সমর্থকরা পাল্টা স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভকারীদের আওয়াজ চেপে দেয়।
এর মধ্যেই প্রবাসী ভারতীয়দের একটি ড্রাম বা ঢোল বাদক দল ‘জনগর জন ঢোল পাঠক’ সরাসরি ওই নব্য-নাৎসিদের সামনে এসে এত জোরে ঢাক-ঢোল বাজাতে শুরু করে যে লেনন নিজের বক্তব্য বন্ধ করতে বাধ্য হয় এবং একপর্যায়ে দলবলসহ সেখান থেকে চলে যায়।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব