চবি প্রতিনিধি: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) কেন্দ্রীয় মসজিদে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আয়োজিত দোয়া ও মিলাদ মাহফিল ঘিরে ঘটেছে ব্যতিক্রমী এক মানবিক ঘটনা। তোবারক শেষ হয়ে যাওয়ার পরও কোনো শিক্ষার্থীকে খালি হাতে ফিরতে দেননি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান। তোবারক না পাওয়া শিক্ষার্থীদের প্রত্যেককে ১০০ টাকা করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি ক্যাম্পাসজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন।
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে বাদ জোহর বিশেষ দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। মাহফিল শেষে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তোবারক বিতরণ করা হয়। আয়োজনকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আগাম প্রস্তুতি অনুযায়ী প্রায় ১ হাজার ১০০ জন শিক্ষার্থীর জন্য তোবারকের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তবে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক সাড়া ও প্রত্যাশার তুলনায় বেশি উপস্থিতির কারণে নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি শিক্ষার্থী মাহফিলে অংশ নেন। ফলে তোবারক বিতরণ শেষ হওয়ার পরও প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ শিক্ষার্থী তোবারক না পেয়ে অনুষ্ঠানস্থলে সারিবদ্ধভাবে অপেক্ষা করতে থাকেন।
তোবারক শেষ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি জানার পরও শিক্ষার্থীদের খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে রাজি হননি উপাচার্য। সাধারণত বড় কোনো আয়োজনে খাবার বা তোবারক শেষ হয়ে গেলে পরে আসা কিংবা বঞ্চিত ব্যক্তিদের কিছু না পেয়েই ফিরে যেতে হয়। তবে চবি প্রশাসনের ক্ষেত্রে ঘটেছে তার ব্যতিক্রম।
মাহফিলে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের অপ্রাপ্তি ও মন খারাপের বিষয়টি অনুধাবন করে তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নেন উপাচার্য ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান। তিনি উপস্থিত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে জানান, মাহফিলে এসে কোনো শিক্ষার্থীই খালি হাতে ফিরবেন না।
এরপর তোবারক না পাওয়া প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ শিক্ষার্থীর প্রত্যেককে তোবারকের সমমূল্য হিসেবে নগদ ১০০ টাকা করে দেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। শুধু নির্দেশ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি উপাচার্য; অনুষ্ঠানস্থলে নিজে উপস্থিত থেকে পুরো বিষয়টি তদারক করেন এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে নগদ অর্থ বিতরণের ব্যবস্থা করেন।
উপাচার্যের এমন তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেক শিক্ষার্থী বিষয়টিকে শুধু ১০০ টাকা পাওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখছেন না; বরং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্ববোধ, আন্তরিকতা ও অভিভাবকসুলভ মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন।
শিক্ষার্থীরা বলেন, তোবারকের প্যাকেটের পরিবর্তে ১০০ টাকা পাওয়া তাদের কাছে মূল বিষয় নয়। বরং তোবারক শেষ হয়ে যাওয়ার পরও প্রশাসন তাদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখেছে এবং কাউকে খালি হাতে ফিরতে দেয়নি—এই বিষয়টিই তাদের কাছে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। তাদের মতে, একজন অভিভাবকের মতো শিক্ষার্থীদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিয়ে উপাচার্যের এমন তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের অনেকেই মনে করছেন, বড় কোনো আয়োজনের ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃতভাবে কিছু শিক্ষার্থী বঞ্চিত হয়ে পড়লেও তাদের সেই অপ্রাপ্তিকে গুরুত্ব দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করা প্রশাসনের ইতিবাচক মানসিকতার পরিচয়। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের অনুভূতি ও সম্মানকে গুরুত্ব দিয়ে ঘটনাস্থলেই বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি ক্যাম্পাসে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের ইতিহাসে এমন উদ্যোগ ব্যতিক্রমী বলেই মনে করছেন শিক্ষার্থীরা। তোবারক শেষ হয়ে যাওয়ার পরও অপেক্ষমাণ শিক্ষার্থীদের কাউকে খালি হাতে ফিরিয়ে না দিয়ে তাদের প্রত্যেকের হাতে নগদ অর্থ তুলে দেওয়ার ঘটনা শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে ইতিবাচক আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
শিক্ষার্থীদের ভাষায়, মাহফিলের তোবারকের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে প্রশাসনের এই মানবিক উদ্যোগ। তাদের প্রত্যাশা, শিক্ষার্থীদের কল্যাণ ও অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়ার এমন ইতিবাচক দৃষ্টান্ত ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আয়োজিত একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের শেষ মুহূর্তে নেওয়া এই ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত তাই শুধু তোবারক বিতরণের ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে এটি হয়ে উঠেছে প্রশাসনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আন্তরিক সম্পর্ক ও অভিভাবকসুলভ দায়িত্ববোধের একটি স্মরণীয় দৃষ্টান্ত।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম