সোমনাথ দে : আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে বাংলাদেশের ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির চতুর্থ কিস্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেলেও ৬৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারের এ কিস্তি ছাড় হয়নি। ঋণ কর্মসূচির শর্ত পূরণে অগ্রগতি নিয়ে আইএমএফ ও বাংলাদেশ সরকারের অবস্থানের মধ্যে পার্থক্যই এর প্রধান কারণ বলে জানা গেছে।
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি শুরু করে আইএমএফ। সাত কিস্তির এ কর্মসূচির আওতায় এখন পর্যন্ত তিন কিস্তিতে ২৩১ কোটি ডলার পেয়েছে বাংলাদেশ। বাকি চার কিস্তিতে আরও ২৩৯ কোটি ডলার পাওয়ার কথা রয়েছে।
চতুর্থ কিস্তির অর্থ গত ডিসেম্বরেই পাওয়ার কথা ছিল। তবে কর্মসূচির বিভিন্ন শর্ত বাস্তবায়নে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়ায় কিস্তি ছাড়ে বিলম্ব হচ্ছে। আইএমএফের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগের কিছু শর্ত এখনো পূরণ হয়নি এবং নতুন কিছু শর্তও পূরণে অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়।
ঋণ কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজস্বনীতি ও রাজস্ব প্রশাসন পৃথক করা, ব্যক্তিগত আয়কর থেকে রাজস্ব বাড়ানো, মূল্য সংযোজন করের (ভ্যাট) হার নির্ধারণ এবং করছাড় কমানো। পাশাপাশি আর্থিক খাত-সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন ও সংশোধন, সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারকে ধীরে ধীরে বাজারনির্ভর করার বিষয়ও কর্মসূচির শর্তের অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এসব শর্তের কিছু তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। সরকারের মতে, সামষ্টিক অর্থনীতির কয়েকটি সূচকে ইতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। চলতি হিসাব, আর্থিক হিসাব ও প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক প্রবণতা থাকায় আইএমএফের কিস্তি পাওয়ার জন্য সরকার অতিরিক্ত চাপ নিতে চায় না।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, আইএমএফের ঋণ কর্মসূচিকে কেবল রাজনৈতিক বা আবেগের দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে বাংলাদেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে হলে শর্তগুলো কীভাবে বাস্তবসম্মতভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সে বিষয়ে আইএমএফের সঙ্গে দ্রুত আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণ কর্মসূচির যেসব সংস্কার বাংলাদেশের অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে প্রয়োজন, সেগুলো আইএমএফের চাপ হিসেবে নয়, বরং দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক প্রয়োজন হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।
চতুর্থ কিস্তি আটকে যাওয়ার প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কী হবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের বাজেট সহায়তার ওপর এর কোনো প্রভাব পড়বে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রতিটি কিস্তি ছাড়ের জন্য আইএমএফের নির্বাহী পর্ষদের অনুমোদন প্রয়োজন। চতুর্থ কিস্তি নিয়ে নির্বাহী পর্ষদের বৈঠক নির্ধারিত সময়ের পরিবর্তে মার্চে হওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তি একসঙ্গে বিবেচনার জন্য জুনের বৈঠকে প্রস্তাব তোলার পক্ষে মত দিয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এখন মূল বিষয় হলো—ঋণ কর্মসূচি অব্যাহত রাখা প্রয়োজন কি না এবং প্রয়োজন হলে শর্তগুলো কীভাবে দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবায়ন করা যায়। এ বিষয়ে আইএমএফ ও সরকারের মধ্যে বাস্তবসম্মত ও দ্রুত সমঝোতা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম