ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: ভারতের সুপ্রিম কোর্টে বুধবার এক ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে নিজের দায়ের করা মামলায় নিজেই যুক্তি উপস্থাপন করেছেন আদালতে। যদিও মমতার আইনের ডিগ্রি আছে।
ভারতের আইন আদালত সংক্রান্ত খবরের পোর্টাল ‘লাইভ ল’ জানিয়েছে, কোনো মুখ্যমন্ত্রী এই প্রথম নিজে শীর্ষ আদালতে সওয়াল করলেন। তবে তিনি অল্প কিছুক্ষণের জন্যই আদালতের সামনে নিজের বক্তব্য পেশ করেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও মুখ্যমন্ত্রীর হয়ে সিনিয়র আইনজীবী শ্যাম দিভানই মূল সওয়াল জবাবটা চালিয়েছেন প্রধান বিচারপতি সুর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি আর বিচারপতি ভিপুল পাঞ্চোলির ডিভিশন বেঞ্চে।
আদালত আজকের শুনানির শেষে নির্দেশ দিয়েছে যাতে মামলার অন্য পক্ষ – ভারতের নির্বাচন কমিশনকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়র দায়ের করা মামলার জন্য আইনি নোটিশ পাঠানো হয়। আগামী সোমবার আবার মামলাটি উঠবে।
সুপ্রিম কোর্টে যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই সওয়াল করবেন, তা আগে থেকেই জানানো হয়েছিল তার দলের পক্ষ থেকে। সেই মতো মঙ্গলবার রাতেই তার নামে বিশেষ পাস দেয় শীর্ষ আদালত।
বুধবার সকালেই পৌঁছে আদালতে গিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দুপুরে যখন মামলাটি শুনানির জন্য ওঠে, তখন অন্যান্য আইনজীবীদের সঙ্গে আদালতে একেবারে সামনের সারিতে দাঁড়িয়েছিলেন। সওয়াল শুরু করেন তার আইনজীবী শ্যাম দিভান। তবে একটা সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতকে বলেন যে তিনি কিছু বলতে চান।
‘লাইভ ল’ এবং আরেকটি পোর্টাল ‘বার অ্যান্ড বেঞ্চ’ এই মামলাটির যে লাইভ রিপোর্টিং করছিল, সেখানে দেখা যাচ্ছে যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতকে বলেন, ‘আমি কি একটু ব্যাখ্যা করতে পারি?’ পাঁচ মিনিট সময় চান তিনি। জবাবে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘পাঁচ কেন, ১৫ মিনিটও বলতে পারেন’।
ডিভিশন বেঞ্চ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মনে করিয়ে দেন যে তাদের হয়ে অন্যতম সেরা আইনজীবী কপিল সিব্বাল এই মামলায় সওয়াল করেছেন। প্রশাসনিক জটিলতাগুলো তিনি খুব ভালো করে আদালতের সামনে ব্যাখ্যা করেছেন। এটা বলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়র বক্তব্য শোনে শীর্ষ আদালত।
আদালতে মমতা বলেন, ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর করার উদ্দেশ্য হলো ‘নাম তোলা নয়, নাম বাদ দেওয়া’।
আইন আদালত সংক্রান্ত আরেকটি পোর্টাল ‘বার অ্যান্ড বেঞ্চ’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে উদ্ধৃত করে জানাচ্ছে, ‘গোটা এসআইআর প্রক্রিয়াটাই বর্তমান ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া, যেখানে তাদের নথি দিয়ে নাগরিকত্ব প্রমাণ করার জন্য বাধ্য করা হচ্ছে। আবার খেয়ালখুশি মতো ২০০২ সালকে কাট-অফ বছর হিসেবে ধরা হলো। এটা তো সংবিধান আর ১৯৫০ এবং ১৯৫১-র জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের লঙ্ঘন’।
মমতা উল্লেখ করেন, যে-সব নারীরা বিয়ের পরে স্বামীর পদবি গ্রহণ করেছেন এবং শ্বশুরবাড়িতে চলে গেছেন, তাদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে পদবি না মেলার যুক্তি দিয়ে।
তিনি আরও বলেন, ‘ওরা শুধু বাংলাকে নিশানা করেছে ভোটের আগে। কেন, ২৪ বছর পরে, যে কাজটা করতে দুবছর লাগার কথা, সেটা দুমাসে শেষ করার কী এত তাড়া ছিল? উৎসবে মরসুমে, চাষের মরসুমে, মানুষ যখন শহরে থাকতে চান না, তখনই মানুষকে উত্ত্যক্ত করা হচ্ছে নোটিশ পাঠিয়ে। একশরও বেশি মানুষ মারা গেছেন। বিএলওরা (বুথ পর্যায়ের কর্মকর্তা) নির্বাচন কমিশনের হেনস্থার কথা চিঠিতে লিখে মারা গেছেন। অনেকে হাসপাতালে ভর্তি। স্যার, আপনিই বলুন, কেন আসামে করা হচ্ছে না? উত্তর পূর্বে কেন করা হচ্ছে না?’
ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধনের কাজে প্রায় আট হাজার মাইক্রো অবজার্ভার নিয়োগ করেছে দেশটির নির্বাচন কমিশন। যাদের নাম নিয়ে সন্দেহ আছে তাদের শুনানিতে ডেকে পাঠিয়ে অতিরিক্ত নথি চাইছে। সেই সব নথির সত্যতা যাচাই করছেন মূলত বিধানসভা আসনভিত্তিক সিনিয়র কর্মকর্তারা। আবার সেই নথি যাচাইয়ের ওপরে নজরদারি করার জন্য মাইক্রো অবজার্ভার নিয়োগ করা হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে মমতা বলেন, ‘আট হাজার মাইক্রো অবজার্ভার নিয়োগ করা হয়েছে বিজেপির থেকে, তারা বুথ লেভেল অফিসারদের ক্ষমতারও ওপরে গিয়ে নাম বাদ দিচ্ছেন। ৫৮ লাখ মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। জীবন্ত মানুষদের মৃত বলে দেওয়া হচ্ছে। বাংলাকে নিশানা করেছে এরা। শুধুমাত্র বাংলার জন্য মাইক্রো অবজার্ভার নিয়োগ করা হয়েছে’।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, নির্বাচন কমিশন অনানুষ্ঠানিকভাবে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে নির্দেশ পাঠাচ্ছে।
এই প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী রাকেশ দ্বিবেদী বলেন, কমিশনকে মাইক্রো অবজার্ভার নিয়োগ করতে হয়েছে, কারণ রাজ্য সরকার প্রয়োজনীয় কর্মকর্তা দেয়নি এসআইআরের কাজের জন্য। একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। রাজ্য সরকারের অসহযোগিতার জন্যই আইন মেনেই মাইক্রো অবজার্ভার নিয়োগ করা হয়েছে।
শুনানির শেষে ডিভিশন বেঞ্চ নির্দেশ দেয় যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়র মামলার ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশনকে নোটিশ পাঠাতে হবে। আগামী সোমবারের মধ্যে তাদের জবাব দিতে হবে।
মাইক্রো অবজার্ভার ইস্যুতে বিচারপতিরা বলেছেন, রাজ্য সরকার যদি কর্মকর্তাদের একটি তালিকা দেয়, যাদের এসআইআরের কাজের জন্য ছেড়ে দেওয়া যাবে, তাহলে 'মাইক্রো অবজার্ভার' দের দায়িত্ব থেকে মুক্ত করা যেতে পারে।
প্রধান বিচারপতি নির্বাচন কমিশনের আইনজীবীকে বলেন, বানান ভুলের জন্য যেন নোটিশ না পাঠানো হয়। এর আগেই শীর্ষ আদালত নির্দেশ দিয়েছিল যে কাদের নাম বাদ যাচ্ছে, কোন যুক্তিতে বাদ দেওয়া হচ্ছে, সেই তালিকা প্রতিটি বুথে পাঠাতে হবে। সূত্র -বিবিসি বাংলা
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব