| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

সিরিয়ার রাষ্ট্রগঠনের সংকট ও দ্রুজ প্রশ্ন : ইসরায়েলি হস্তক্ষেপ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা

reporter
  • আপডেট টাইম: মে ০৪, ২০২৫ ইং | ০০:০০:০০:পূর্বাহ্ন  |  ১৭৮৬১৮৬ বার পঠিত
সিরিয়ার রাষ্ট্রগঠনের সংকট ও দ্রুজ প্রশ্ন : ইসরায়েলি হস্তক্ষেপ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা
ছবির ক্যাপশন: সিরিয়ার রাষ্ট্রগঠনের সংকট ও দ্রুজ প্রশ্ন : ইসরায়েলি হস্তক্ষেপ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা

আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি:

প্যালেস্টাইনে জাতিধ্বংসী নরসংহার চালানো ইসরায়েল এবার সিরিয়ায় সংখ্যালঘু 'দ্রুজ' সম্প্রদায়কে রক্ষা করার নামে সেখানে বোমাবর্ষণ শুরু করেছে। গত সপ্তাহে সিরিয়ার রাজধানী দামাস্কাসে রাষ্ট্রপতি প্রাসাদ এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলার ঘটনা সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে অস্থির করে তুলেছে। এই বিমান হামলার ফলে রাজধানীর কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক জোনে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়, যা সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করে। সিরিয়ার সরকারি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, রাষ্ট্রপতি প্রাসাদের একেবারে নিকটবর্তী একটি নিরাপত্তা স্থাপনা ছিল হামলার মূল লক্ষ্য।সিরিয়ার রাষ্ট্রপতি আহমেদ আল-শারা'র দপ্তর এক বিবৃতিতে এই হামলাকে “বিপজ্জনক বৃদ্ধি” হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং একে দেশের সার্বভৌমত্বের উপর সরাসরি আঘাত বলে অভিহিত করেছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ইসরায়েলের এমন কার্যকলাপ মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে দেওয়ার একটি সচেতন প্রচেষ্টা, যা কেবল সিরিয়াকেই নয়, পুরো অঞ্চলকেই অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে। ইসরায়েল অভিযোগ করেছে, সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুজ সংখ্যালঘুদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং এর জবাবেই এই হামলা।


এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় সিরিয়ার মিত্র দেশগুলোর দিক থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ইরান এবং রাশিয়া ঘটনাটির কঠোর নিন্দা জানিয়েছে এবং ইসরায়েলকে এমন একতরফা সামরিক অভিযান থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে দামাস্কাসের মতো একটি রাজনৈতিক ও প্রতীকী গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় হামলা চালানোকে তারা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে।বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই হামলা ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি একটি কৌশলের অংশ, যার উদ্দেশ্য সিরিয়ায় ইরানপন্থী মিলিশিয়া ও সামরিক উপস্থিতি কে দুর্বল করা। তবে দামাস্কাসের কেন্দ্রস্থলে এমন সরাসরি  আক্রমণ সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধরনের উসকানি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে সিরিয়া-ইসরায়েল সম্পর্ক আরও অবনতি ঘটবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।রাষ্ট্রসংঘের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দূত এই ঘটনার পর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সিরিয়ার চলমান সংকটে আরও একটি যুদ্ধ ফ্রন্ট যুক্ত হলে মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হবে।


এই ঘটনার মধ্য দিয়ে সিরিয়া-ইসরায়েল সংঘাত আবারও নতুন মাত্রা পেল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আঞ্চলিক সমীকরণ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার উপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতে এই উত্তেজনা কোন পথে মোড় নেবে। তবে এখনই স্পষ্ট, দামাস্কাসে রাষ্ট্রপতি প্রাসাদের নিকটে ইসরায়েলের এই হামলা শুধু সামরিক নয়, প্রতীকী অর্থেও এক চরম চ্যালেঞ্জ।সিরিয়া একাধিক যুদ্ধ ও বিপর্যয়ের ধাক্কা সামলে একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করলেও, দেশটির অভ্যন্তরীণ সহিংসতা, সাম্প্রদায়িক বিভাজন এবং আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ মিলিয়ে জাতিগঠনের পথ আরও দুর্গম হয়ে উঠছে। সম্প্রতি দ্রুজ সংখ্যালঘুদের ঘিরে সৃষ্টি হওয়া সহিংসতা এবং ইসরায়েলের আগ্রাসন সিরিয়ার ভূ রাজনৈতিক বাস্তবতাকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইসরায়েলের সামরিক উপস্থিতি, সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েন, দ্রুজ সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব সংকট এবং আন্তর্জাতিক নিষ্ক্রিয়তা মিলে একটি সম্ভাব্য রাষ্ট্রব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।সিরিয়ার  রাষ্ট্রপতির দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কোনো আপস করবে না এবং সমস্ত সম্ভাব্য উপায়ে জনগণের অধিকার রক্ষা করবে। এই বিবৃতির মাধ্যমে একদিকে অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধের বার্তা দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে আরব রাষ্ট্রসমূহ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সমর্থনের জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে।


ইসরায়েল এর প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছেন, সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারকে বার্তা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই হামলা। তারা বলেছে, ইসরায়েল দক্ষিণ দামাস্কাসে বা দ্রুজ অধ্যুষিত অঞ্চলে কোনো হুমকি বা সেনা মোতায়েন মেনে নেবে না। এই বক্তব্যে আড়াল করে রাখা হয়েছে এক দীর্ঘমেয়াদি কৌশল, গোলান হাইটস সংলগ্ন অঞ্চলকে একটি স্থায়ী নিরাপত্তা বলয়ে রূপান্তর, যাতে সিরিয়া ও ইরানের প্রভাব প্রতিরোধ করা যায়। ইসরায়েলি ড্রোন ও রিকনেসান্স বিমান সিরিয়ার আকাশে নিয়মিত টহল দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতের আরও প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের সংকেত বহন করছে।


এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছে সিরিয়ার দ্রুজ সম্প্রদায়। এই সংখ্যালঘু গোষ্ঠী ঐতিহাসিকভাবে নিরপেক্ষতা বজায় রাখলেও চলমান সহিংসতা ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ফলে তারা একটি অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। সম্প্রতি সিরিয়ার সরকারপন্থী বাহিনী ও দ্রুজ যোদ্ধাদের মধ্যে সংঘর্ষে শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। দ্রুজ আধ্যাত্মিক নেতা শেখ হিকমত আল-হিজরি একে “গণহত্যার অভিযান” বলে অভিহিত করেছেন এবং আন্তর্জাতিক বাহিনীকে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। এর জবাবে ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়োন সা'র দাবি করেছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত সিরিয়ার সংখ্যালঘুদের রক্ষা করা, বিশেষ করে দ্রুজদের।এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েল নিজেকে রক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, যদিও দ্রুজ সম্প্রদায়ের সিনিয়র নেতারা এই ভূমিকাকে “cynical manipulation” হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের স্পষ্ট বক্তব্য, ইসরায়েলের সাহায্যের দরকার নেই এবং এই ধরনের হস্তক্ষেপ একমাত্র রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির কৌশল। ইসরাইলের মূল লক্ষ্য সিরিয়ার দক্ষিণ সীমান্তে একটি স্থায়ী ‘বাফার জোন’ তৈরি করা, যার মাধ্যমে ইরান ও হিজবুল্লাহর প্রভাব ঠেকানো যাবে এবং ভবিষ্যতে ভূখণ্ডগত দখলের পথ প্রশস্ত হবে।


আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়া এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা হতাশাজনক। জাতিসংঘ, আরব লীগ কিংবা ইউরোপীয় শক্তিগুলো সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেয়নি। মানবাধিকার রক্ষার কথা বললেও, এই ঘটনাগুলোর প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলের ভূমিকা নীরবতা ও দ্বিচারিতার উদাহরণ হয়ে উঠেছে। ইউক্রেন কিংবা গাজা পরিস্থিতির তুলনায় সিরিয়া যেন এক নিষিদ্ধ নাট্যমঞ্চ, যেখানে যুদ্ধ আর নীতিহীনতা একসাথে সহাবস্থান করছে। এই নিষ্ক্রিয়তা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের জনগণের আস্থাহীনতাকে আরো গভীর করে তুলছে।


সিরিয়ার অভ্যন্তরেও রাজনৈতিক পুনর্গঠন ও জাতি গঠনের প্রশ্ন সামনে এসেছে। আহমেদ আল-শারা যে জোটের মাধ্যমে বাশার আল-আসাদকে উৎখাত করে ক্ষমতায় এসেছেন, সেই জোট আজ বিভক্ত, আদর্শগতভাবে বিভ্রান্ত এবং বহু ক্ষেত্রেই পরস্পরবিরোধী। এই সরকার রাষ্ট্রের ঐক্য রক্ষায় একদিকে ‘জাতীয় ঐক্য’-র কথা বলছে, অন্যদিকে সামরিক বাহিনী ও মিত্র মিলিশিয়াদের মাধ্যমে প্রতিপক্ষ দমন করছে। মার্চ মাসে আলাউয়াইট জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যা—যেখানে সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটসের মতে ১,৭০০ এর বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে—এই সরকারের উপর মানবিক ও নৈতিক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।


সিরিয়া যদি একটি কার্যকর, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠতে চায়, তবে তার জন্য কেবল জাতীয় ঐক্য নয়, বিশ্বাসযোগ্য ন্যায়বিচার, সংখ্যালঘুদের সাংবিধানিক সুরক্ষা এবং বৈদেশিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাজনৈতিক কাঠামো অপরিহার্য। দ্রুজ, আলাওয়াইট, কুর্দি ও সুন্নি সম্প্রদায়ের মধ্যে যে গভীর অবিশ্বাসের রেখা তৈরি হয়েছে, তা পারস্পরিক সহাবস্থান ছাড়া মোচন সম্ভব নয়।এই মুহূর্তে ইসরায়েলি হুমকি, দ্রুজ অস্তিত্ব সংকট, আন্তর্জাতিক নীরবতা ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অসঙ্গতি মিলে সিরিয়া এমন এক সময়ের মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে রাষ্ট্র হিসেবে বেঁচে থাকার প্রশ্নই মুখ্য। রাষ্ট্রপতি আল-শারা’র সরকার এই সংকট থেকে উত্তরণে সক্ষম হবে কিনা, তা নির্ভর করবে তার অন্তর্দৃষ্টি, অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক সমর্থনের বাস্তবধর্মী সংগঠনের উপর।সিরিয়ার ভবিষ্যৎ শুধু অস্ত্র বা ভূখণ্ডের নয়, বরং পরিচয়, ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার লড়াই। এবং এই লড়াইয়ে দ্রুজ দের মতো সংখ্যালঘুরা আবারো এক গভীর পরীক্ষার মুখোমুখি।


রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪