আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ছয় সপ্তাহ ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় অংশ নিতে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অবস্থান করছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ প্রতিনিধিরা। তবে আলোচনার শুরু নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, কারণ তেহরান স্পষ্ট জানিয়েছে,লেবাননে যুদ্ধবিরতি ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের নিশ্চয়তা ছাড়া তারা আলোচনা শুরু করবে না।
শনিবার (১১ এপ্রিল) সকালে দুইটি মার্কিন বিমানযোগে ইসলামাবাদে পৌঁছান যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দল। দলটির নেতৃত্ব দেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনির এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার তাদের স্বাগত জানান।
এর আগে শুক্রবার ইসলামাবাদে পৌঁছান ইরানের প্রতিনিধি দল। তাদের নেতৃত্বে রয়েছেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের লিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাবা আব্বাস আরাকচি।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর এটিই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের আলোচনা। ২০১৫ সালের পর এই প্রথম দুই দেশের মধ্যে সরাসরি মুখোমুখি বৈঠক হতে যাচ্ছে, যখন তারা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছিল। তবে ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ওই চুক্তি বাতিল করেন। একই বছর ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা নিষিদ্ধ করেছিলেন।
ইরানি স্পিকার ক্বালিবাফ সামাজিক মাধ্যমে জানান, যুক্তরাষ্ট্র আগে ইরানের জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করা এবং লেবাননে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হলে আলোচনা শুরু হবে না। মার্চ থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বলছে, লেবাননের সংঘাত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির অংশ নয়। তবে তেহরান এই দুই ইস্যুকে একই প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত বলে দাবি করছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে ইরানকে কড়া বার্তা দিয়ে বলেন, “ইরানিদের বুঝতে হবে তাদের হাতে কোনো শক্ত কার্ড নেই, আন্তর্জাতিক জলপথ ব্যবহার করে সাময়িক চাপ সৃষ্টি করা ছাড়া।” ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সও আলোচনায় ইতিবাচক ফলের আশা প্রকাশ করলেও সতর্ক করে বলেন, প্রতারণার চেষ্টা হলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর অবস্থান নেবে।
ইসলামাবাদে উভয় পক্ষের অগ্রবর্তী প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রাথমিক আলোচনা ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ইরানের প্রায় ৭০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলে অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও রাজনীতির বিশেষজ্ঞরা রয়েছেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১০০ সদস্যের একটি অগ্রবর্তী দলও শহরে অবস্থান করছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের সঙ্গে ইরানি প্রতিনিধিদের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে সম্ভাব্য আলোচনার সময়সূচি ও কাঠামো নির্ধারণ হতে পারে।
আলোচনা উপলক্ষে ইসলামাবাদে জোরদার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শহরজুড়ে সেনা ও আধাসামরিক বাহিনীর হাজারো সদস্য মোতায়েন রয়েছে।
মঙ্গলবার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন ট্রাম্প, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা বন্ধ রয়েছে। তবে ইরানের হরমুজ প্রণালী অবরোধ এখনো বহাল রয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে।
ইরান আলোচনায় আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলেছে,দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ স্বীকৃতি এবং যুদ্ধজনিত ক্ষতিপূরণ। এসব দাবি বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
এদিকে লেবানন ইস্যুতেও উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবাননের কর্মকর্তাদের বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও, তা যুদ্ধবিরতি নাকি সরাসরি শান্তি আলোচনা এ নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এক বার্তায় যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করে বলেন, আমাদের দেশের ওপর হামলাকারীদের শাস্তি ছাড়া আমরা থামব না।
যদিও ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধকে সফল দাবি করছে, তবে তাদের ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর অনেকটাই অর্জিত হয়নি। ইরান এখনো প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলার সক্ষমতা ধরে রেখেছে এবং তাদের কাছে প্রায় ৪০০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে, যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি পর্যায়ে।
যুদ্ধের ধাক্কা সামাল দিয়েও ইরানের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এখনো কোনো সুসংগঠিত অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দেখা যায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না এলে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি