তাওহীদাহ্ রহমান নূভ:
বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণের সাম্প্রতিক ভয়াবহতা কোনো আকস্মিক সুনামি নয়; বরং এটি আমাদের সামষ্টিক সামাজিক পচন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং দীর্ঘদিনের মনস্তাত্ত্বিক বিকারের এক চূড়ান্ত বিস্ফোরণ। কোনো সমাজ যখন তার সবচেয়ে দুর্বল এবং নিরীহ অংশটিকে—অর্থাৎ শিশুদের—সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন বুঝতে হবে সেই সভ্যতার মেরুদণ্ড ভেঙে পড়েছে। শিশু ধর্ষণ কেবল একটি একক অপরাধ নয়; এটি ক্ষমতা, বিকৃত কাম, রাজনৈতিক প্রশ্রয় এবং কুৎসিত পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর এক সম্মিলিত বিষাক্ত ফসল।
১. ভোগের বস্তু বনাম মানুষের সত্তা: মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতির গোড়াপত্তন
আমাদের সমাজ কাঠামোর গলদটা একদম গোড়ায়। শৈশব থেকেই যেখানে পুরুষকে শেখানো হয় তার আদিম কামনা "স্বাভাবিক" বা অনিয়ন্ত্রণযোগ্য, সেখানে নারীকে শেখানো হয় নিজেকে গুটিয়ে রাখতে, লুকিয়ে রাখতে। এই মনস্তত্ত্বই কালক্রমে একজন সম্ভাব্য ধর্ষকের জন্ম দেয়।
এর সাথে যখন যুক্ত হয় ধর্মীয় লেবাসধারী কিছু চরমপন্থী ও পিতৃতান্ত্রিক বয়ান—যেখানে নারীকে 'তেঁতুল', 'ফিতনা' কিংবা 'পুরুষের পাপের উৎস' হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হয়—তখন তা শুধু বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এগুলো সাধারণ মানুষের অবচেতনে নারীর মানবিক সত্তাকে হত্যা করে। ফলে নারী আর রক্ত-মাংসের মানুষ থাকে না, পরিণত হয় স্রেফ ভোগের বস্তুতে। মনোবিজ্ঞানের সূত্র বলে, আপনি যখন কাউকে 'মানুষ' ভাবা বন্ধ করে দেবেন, তখন তার প্রতি যেকোনো স্তরের সহিংসতা চালানো আপনার জন্য সহজ হয়ে যাবে।
২. যৌন দমননীতি এবং ডিজিটাল বিকারগ্রস্ততা
আমাদের সমাজে সুস্থ যৌন শিক্ষার (Consent and Sexual Education) চরম অভাব রয়েছে। সম্মতি বা ‘কনসেন্ট’ কী, সম্পর্কের মানবিক দায়বদ্ধতা কী—তা কোথাও শেখানো হয় না। উল্টো যৌনতাকে একটি চরম 'পাপ' বা 'ট্যাবু' হিসেবে চেপে রাখা হয়। এই ভয়ংকর যৌন দমননীতি (Sexual Repression) তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তৈরি করছে এক অসুস্থ কৌতূহল।
এই দমনের সমান্তরালে অবাধে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল যুগের অন্ধকার দিক। হাতের মুঠোয় থাকা অতি-সহিংস পর্নোগ্রাফি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নারীবিদ্বেষী কনটেন্ট, বিষাক্ত পুরুষতান্ত্রিক মোটিভেশনাল স্পিচ এবং ধর্মীয় উগ্রতার মিশ্রণ তরুণদের মগজ ধোলাই করছে। সুস্থ বিনোদন ও মানবিক মূল্যবোধের অভাবে তৈরি হওয়া এই মানসিক হাতাশা ও বিকৃতি যখন বিস্ফোরিত হয়, তখন তার সহজতম শিকার হয় একটি শিশু। কারণ শিশু দুর্বল, সে প্রতিবাদ করতে পারে না, তাকে ভয় দেখানো সহজ এবং সে লোকলজ্জায় চুপ থাকে।
৩. বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও অপরাধীর ‘ভয়ংকর আত্মবিশ্বাস’
আইনের শাসন যেখানে দুর্বল, সেখানে অপরাধীর সাহস আকাশচুম্বী হবে—এটাই স্বাভাবিক। প্রতিদিন মানুষ দেখছে ক্ষমতার জোরে বা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পার পেয়ে যাচ্ছে বড় বড় অপরাধী। বছরের পর বছর ঝুলে থাকে মামলা, অন্যদিকে ভুক্তভোগী পরিবারটিকে পোহাতে হয় সামাজিক লাঞ্ছনা।
এই দৃশ্যমান বিচারহীনতা অপরাধীদের মনে এক ভয়ংকর আত্মবিশ্বাস তৈরি করে যে—"আমার কিছুই হবে না।" আইনের এই দীর্ঘসূত্রতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার অপরাধের সংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে।
৪. সহিংসতার উত্তরাধিকার ও জৈবিক তত্ত্বের কুযুক্তি
সহিংসতা সবসময় নতুন সহিংসতার জন্ম দেয়। যে শিশুটি নিজে পারিবারিক বা সামাজিক নির্যাতন, মারধর এবং অপমানের মধ্য দিয়ে বড় হয়, তার অবচেতনে এক বিকৃত ক্ষমতালিপ্সা ও জিঘাংসা জমা হতে থাকে। বড় হয়ে সেও দুর্বল কারও ওপর সেই ক্ষমতার চর্চা করতে চায়।
দুর্ভাগ্যবশত, এই আধুনিক যুগেও কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবী বা চিন্তক পুরুষের এই পাশবিকতাকে 'আদিম পলিগ্যামি প্রবৃত্তি' বা 'পুরুষের স্বভাবই এমন' তত্ত্ব দিয়ে জৈবিকভাবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন। অথচ মানব সভ্যতার মূল ভিত্তিই ছিল শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের আদিম ও পশুতুল্য প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা। মানুষ যদি কেবলই তার জৈবিক কামনার দাস হতো, তবে আইন, আদালত, রাষ্ট্র বা নৈতিকতার কোনো প্রয়োজনই থাকত না।
৫. কাঠগড়ায় ভুক্তভোগী: সভ্যতার এক চরম পরিহাস
আমরা এমন এক অদ্ভুত ও বৈপরীত্যে ভরা সমাজে বাস করি, যেখানে সাত বছরের এক শিশুর ধর্ষণের পর অপরাধীর শাস্তির চেয়ে বেশি আলোচনা হয় শিশুটির বা তার মায়ের পোশাক নিয়ে! ‘ভিকটিম ব্লেমিং’ বা ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার এই সস্তা মানসিকতা প্রমাণ করে যে, অপরাধীর চেয়ে আমাদের সমাজ কাঠামোর ভেতরের পচন কতটা গভীর।
একটি সমাজ তখনই ভেতর থেকে মৃত ও পঙ্গু হয়ে যায়, যখন তার শিশুরা নিজের ঘরে, চেনা পরিবেশে বা স্কুলেও নিরাপদ থাকে না। শিশু ধর্ষণ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক রাষ্ট্র, সমাজ ও সংস্কৃতির এক মানসিক মহামারী। কেবল কঠোর আইন বা লোকদেখানো ফাঁসির রায় দিয়ে এই মহামারী ঠেকানো যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন আইনি ব্যবস্থার আমূল সংস্কার, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, জেন্ডার-সংবেদনশীল শিক্ষা এবং নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন। যতক্ষণ না আমরা নারীকে বা শিশুকে 'ভোগের বস্তু'র ঊর্ধ্বে উঠে স্বাধীন 'মানুষ' হিসেবে দেখতে শিখব, ততক্ষণ এই সভ্যতার পচন রোধ করা অসম্ভব।
লেখক: কবি ও সম্পাদক (কবিয়াল)