স্টাফ রিপোর্টার: ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘদিনের করজটের মধ্যে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বড় ধরনের কর সংস্কারের পথে হাঁটছে সরকার। ব্যবসায়ীদের করের চাপ কমানো, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং রাজস্ব ব্যবস্থাকে আরও পূর্বাভাসযোগ্য করতে একগুচ্ছ পরিবর্তনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এবারের বাজেটে সবচেয়ে আলোচিত প্রস্তাবগুলোর একটি হচ্ছে আমদানিকৃত প্রাথমিক ও শিল্প কাঁচামালের ওপর অগ্রিম আয়কর (এআইটি) কমানো। একই সঙ্গে আগামী পাঁচ বছরের সম্ভাব্য করহার আগাম ঘোষণা, সাধারণ করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, অতি ধনীদের জন্য সম্পদ কর চালু এবং অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার নতুন সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন। সরকারের লক্ষ্য থাকবে একদিকে রাজস্ব আদায় ধরে রাখা, অন্যদিকে ব্যবসা ও বিনিয়োগের ওপর অতিরিক্ত চাপ কিছুটা কমানো।
কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে বর্তমানে ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর দিতে হয়। নতুন প্রস্তাবে এ হার পণ্যের ধরন অনুযায়ী ৪ শতাংশ কিংবা ৩ শতাংশে নামিয়ে আনার চিন্তা করছে সরকার। প্রাথমিক কাঁচামাল বলতে প্রাকৃতিক সম্পদভিত্তিক উপকরণ বোঝানো হয়। আর শিল্প কাঁচামাল হলো এমন উপাদান, যা ব্যবহার করে চূড়ান্ত বা আধা-চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদন করা হয়। দেশীয় শিল্প উৎপাদনে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ এবং কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে এই সুবিধা দেওয়া হতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, গত ১৪ মে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নীতিগতভাবে এ প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছেন। ওই বৈঠকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি ফেরানো এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কয়েকটি কর সংস্কার প্রস্তাব উপস্থাপন করে। ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন, আমদানি পর্যায়ে উচ্চ হারের অগ্রিম আয়কর তাদের নগদ অর্থপ্রবাহে বড় চাপ তৈরি করছে। এতে আমদানিনির্ভর শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং কার্যকর মূলধনের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) চেয়ারম্যান আবুল কাশেম খান বলেন, অস্বাভাবিক উচ্চ হারের অগ্রিম আয়কর কমানো উচিত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা পুরোপুরি প্রত্যাহারও প্রয়োজন। তাঁর মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত করদায়িত্বের চেয়ে বেশি অগ্রিম কর আদায় হলে তা দ্রুত ফেরত দেওয়া বা ভবিষ্যৎ করদায়ের সঙ্গে সমন্বয়ের সুযোগ থাকতে হবে। বর্তমানে সেই ব্যবস্থা কার্যকর না থাকায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের তারল্য সংকটে পড়ছে।
এবারের বাজেটে ‘সম্পদ কর’ও আলোচনায় রয়েছে। বর্তমানে উচ্চ সম্পদের ব্যক্তিদের ওপর সারচার্জ আরোপ করা হয় প্রদেয় আয়করের ভিত্তিতে। নতুন প্রস্তাবে সারচার্জ তুলে দিয়ে সরাসরি সম্পদের মূল্যের ওপর কর আরোপের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ৪ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকার সম্পদ থাকলে ০.৫০ শতাংশ, ১০ কোটি থেকে ২০ কোটি টাকার মধ্যে হলে ১ শতাংশ, ২০ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকার মধ্যে হলে ১.৫০ শতাংশ এবং ৫০ কোটির বেশি সম্পদের ক্ষেত্রে ২ শতাংশ কর আরোপ হতে পারে। তবে কর কর্মকর্তারা বলছেন, এই সম্পদ কর কোনোভাবেই করদাতার মোট প্রদেয় আয়করের চেয়ে বেশি হবে না।
উচ্চ সিসির বিলাসবহুল গাড়ির ওপর অগ্রিম আয়করও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ৩০০১ থেকে ৩৫০০ সিসির গাড়ির ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর দ্বিগুণ করে ৪ লাখ টাকা এবং ৩৫০০ সিসির বেশি গাড়ির ক্ষেত্রে ৫ লাখ টাকা করার চিন্তা করা হচ্ছে।
দেশে ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্য কমানো এবং রাজস্ব আদায় বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে অতি উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ওপর করের চাপ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, বছরে দেড় কোটি টাকার বেশি আয়কারীদের জন্য আয়করের সর্বোচ্চ হার বর্তমান ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করা হতে পারে। বর্তমানে বছরে ৩৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকার বেশি আয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ করহার প্রযোজ্য। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে মাসিক প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বা তার বেশি আয়কারীরা নতুন ৩৫ শতাংশ করসীমার আওতায় পড়বেন।
এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের লক্ষ্য ‘সুপার রিচ’ শ্রেণি থেকে বেশি কর আদায় নিশ্চিত করা। তাদের মতে, উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ওপর বাড়তি কর আরোপের মাধ্যমে সামাজিক বৈষম্য কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব। রাজস্ব বোর্ডের হিসাবে দেশে প্রায় ৩০ হাজার করদাতা রয়েছেন, যাদের আয় দেড় কোটি টাকার বেশি। নতুন করহার কার্যকর হলে অতিরিক্ত প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের আশা করা হচ্ছে।
এর আগে চলতি বছরের মার্চে বাজেট-সংক্রান্ত এক আলোচনায় এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান অতি ধনীদের ওপর ৩৫ শতাংশ করহার আরোপের পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে উল্লেখ করেছিলেন। তবে অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারণী মহলে এ নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। কেউ কেউ এটিকে বৈষম্য কমানোর ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে মনে করছেন কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া শুধু করহার বাড়ালে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, বেশি আয়কারীদের কাছ থেকে বেশি কর নেওয়া ন্যায্য উদ্যোগ। তবে কর ফাঁকি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে শুধু করহার বাড়িয়ে রাজস্ব আদায়ে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খানও বলেছেন, এনবিআরের দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে বছরের পর বছর একই করদাতাদের ওপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে। তাঁর মতে, করের আওতা সম্প্রসারণ ও কর ফাঁকি রোধে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে নতুন করহার দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।
বাংলাদেশে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অন্যতম বড় অভিযোগ করনীতির অস্থিরতা। প্রায় প্রতি বাজেটেই করহার, শুল্ক বা কর অব্যাহতির নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে, যা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে কঠিন করে তোলে। এ অবস্থায় সরকার এবার পাঁচ বছরের সম্ভাব্য করহার কাঠামো আগাম ঘোষণা করার চিন্তা করছে। এনবিআরের করনীতি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, করব্যবস্থাকে পূর্বাভাসযোগ্য করার উদ্যোগ হিসেবে এটি বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ফিকি) দীর্ঘদিন ধরে স্থিতিশীল কর কাঠামোর দাবি জানিয়ে আসছে। কর বিশেষজ্ঞ ও এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া মনে করেন, শুধু করহার আগে থেকে জানালেই হবে না, সেটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণও হতে হবে। তাঁর ভাষায়, বিশ্বজুড়ে করহার কমছে, কিন্তু বাংলাদেশে যদি তুলনামূলক বেশি করহার বহাল থাকে, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা কঠিন হবে।
সাধারণ করদাতাদের চাপ কমাতে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হতে পারে। বর্তমানে করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৩ লাখ টাকা। নতুন বাজেটে তা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হতে পারে। ব্যবসায়ী সংগঠন ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় করমুক্ত আয়সীমা অন্তত সাড়ে ৪ লাখ টাকা করার দাবি জানিয়েছে।
এতে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীদের কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় এই ছাড় খুব বড় নয়।
বাজেটে অপ্রদর্শিত আয় বা কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ ফের চালু হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে এবার আগের মতো নির্দিষ্ট কম হারে নয়, বরং নিয়মিত করহারেই এই সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অর্থাৎ, যে অর্থবছরে আয় গোপন করা হয়েছিল, সেই সময়কার নির্ধারিত করহার অনুযায়ী কর পরিশোধ করে সম্পদ বৈধ করা যাবে। পাশাপাশি আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থাও রাখা হতে পারে, যাতে আয়কর বিভাগ বা অন্য কোনো সংস্থা আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলতে না পারে।
এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, আবাসন খাতে দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃত লেনদেনমূল্য গোপন করার প্রবণতা রয়েছে। মৌজা মূল্য ও বাজারমূল্যের বড় পার্থক্যের কারণে বিপুল পরিমাণ অর্থ অপ্রদর্শিত থেকে যায়। তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, দুর্নীতির অর্থ বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হলে তা নৈতিক ও অর্থনৈতিক দুই দিক থেকেই নেতিবাচক বার্তা দেবে।
সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, এবারের বাজেটে সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হবে রাজস্ব আদায় ও বিনিয়োগ উৎসাহের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। একদিকে উচ্চ ব্যয় মেটাতে রাজস্ব বাড়াতে হবে, অন্যদিকে অতিরিক্ত করের চাপে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাত আরও সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। এ অবস্থায় কাঁচামালে এআইটি কমানো, করহার আগাম ঘোষণা এবং কর কাঠামোকে আরও স্থিতিশীল করার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা ব্যবসায়ীদের আস্থা ফেরাতে সহায়ক হতে পারে।
রিপোর্টার্স২৪/বাবি