| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

বড় হয়ে ডাক্তার হতে চেয়েছিল রামিসা

reporter
  • আপডেট টাইম: মে ২২, ২০২৬ ইং | ২২:২৬:৪৭:অপরাহ্ন  |  ৭৮৫ বার পঠিত
বড় হয়ে ডাক্তার হতে চেয়েছিল রামিসা

স্টাফ রিপোর্টার: মাত্র ১০ টাকার ছোট্ট চাহিদা ছিল রামিসার। স্কুলের টিফিন খাবে, কখনও প্রিয় কোনো খাবার কিনবে। মায়ের অসুস্থতা দেখলে বলত, ‘আমি বড় হয়ে ডাক্তার হবো, তোমার চিকিৎসা করব।’ ড্রইং খাতায় কাবা শরিফ এঁকে বাবাকে বলেছিল, ‘আমাকে কিন্তু এখানে নিয়ে যাবে।’ স্বপ্নভরা সেই শিশুটি আজ নেই। পল্লবীর ছোট্ট বাসাজুড়ে এখন শুধু কান্না, দীর্ঘশ্বাস আর শোকের ভারী নীরবতা।

রাজধানীর পল্লবীর ৭ নম্বর সড়কের ৩৭ নম্বর বাড়ির নিচে ঝুলছে একটি সাদা ব্যানার। সেখানে ফুটফুটে শিশু রামিসার হাসিমাখা ছবি। ব্যানারে লেখা, ‘রামিসা হত্যার বিচার চাই, হত্যাকারীর জনসম্মুখে ফাঁসি চাই।’

শুক্রবার (২২ মে) সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনের নিচে ভিড় করছেন স্থানীয়রা। সবার কণ্ঠে একটাই দাবি— ছোট্ট শিশুটির হত্যাকারীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। প্রিয় সন্তানকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা ও মা পারভীন আক্তার। পুরো পরিবারজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রামিসার মা পারভীন আক্তার বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। প্রতিদিন অনেক টাকার ওষুধ খেতে হয়। রামিসা বলত, বড় হয়ে ডাক্তার হবে, আমার চিকিৎসা করবে। কিন্তু আমার মেয়ে আর ডাক্তার হতে পারল না।’

ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বারবার ভেঙে পড়েন তিনি। বলেন, ‘আমার মেয়েই যে চিৎকার দিচ্ছিল, সেটা বুঝতে পারিনি। মনে করেছি, বড় বোনের সঙ্গে গেছে। পরে দেখি বড় মেয়ে একা ফিরছে। তখনই খোঁজ শুরু করি। সব ফ্ল্যাটের দরজায় ধাক্কা দিয়েছি। কিন্তু ওই ঘরের দরজা খোলেনি।’

তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে একটি জুতা পরেছিল, আরেকটি পরারও সুযোগ পায়নি। দরজার সামনে পড়ে থাকা জুতা দেখে সন্দেহ হয়। পরে সবাই এসে দরজা ভেঙেছে। পেছনের দিক দিয়ে তাকে পালিয়ে যেতে দেখেছে আশপাশের মানুষ।’

মেয়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন মাত্র ১০ টাকা চাইত। ওই টাকা দিয়ে টিফিন খেত। ছোট ছোট আবদার ছিল।’ এরপর আর কোনো কথা বলতে পারেননি তিনি। শুধু নীরবে চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু।

ভুক্তভোগী শিশুটির বড় বোন রাইসাও কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি জানান, রাস্তার ওপারে চাচার বাসায় যাওয়ার সময় ছোট বোনকে ঘরে থাকতে বলে বের হয়েছিলেন। কিন্তু অজান্তেই রামিসা তার পিছু নেয়।

রাইসা বলেন, ‘আমি বুঝতেই পারিনি ও পেছনে এসেছে। তখনই লোকটা দরজার সামনে থেকে ওকে টেনে নিয়ে যায়। ও চিৎকার করছিল। মা সেই শব্দ শুনেছিলেন।’

তিনি আরও বলেন, অভিযুক্ত সোহেল রানাদের সঙ্গে তাদের পরিবারের কোনো সম্পর্ক বা কথাবার্তা ছিল না। কয়েক মাস আগে ওই ভবনে ভাড়া এলেও তাদের সঙ্গে কখনও যোগাযোগ হয়নি।

রামিসার স্কুলের বাংলা বিষয়ের শিক্ষিকা মালিহা ইসলাম বলেন, ‘রামিসা খুব মেধাবী, চঞ্চল আর ভীষণ প্রাণবন্ত ছিল। ক্লাসে সামনের বেঞ্চে বসত। দেখা হলেই বলত, “মিস, আপনাকে সুন্দর লাগছে।” পড়া বুঝতে না পারলে এসে বলত, “মিস, একটু বুঝিয়ে দেন।” এমন নিষ্পাপ একটা মেয়ের এমন পরিণতি কখনও কল্পনাও করিনি।’

ঘটনার পর রামিসার বাসায় গিয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন তিনি। তার দাবি, যেহেতু আসামি জবানবন্দি দিয়েছে, তাই দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া উচিত।

মিরপুরের পপুলার মডেল হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘রামিসা শুধু মেধাবীই ছিল না, ছিল স্বপ্নে ভরা এক শিশু।’ তিনি জানান, প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় বাংলা বিষয়ে ৯০, ইংরেজিতে ৯৩, গণিতে ৯৫.৫, ধর্মে ৯৫ এবং ড্রইংয়ে ৯৬ নম্বর পেয়েছিল রামিসা।

পরীক্ষার খাতা দেখাতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন প্রধান শিক্ষক। তিনি বলেন, ‘ড্রইং পরীক্ষায় রামিসা কাবা শরিফ এঁকে বাবাকে বলেছিল, “আমাকে কিন্তু এখানে নিয়ে যাবে।” বাবা বলেছিলেন, “সুযোগ হলে নিয়ে যাব।” সেই স্বপ্ন এখন শুধু স্মৃতি।’

রামিসার সহপাঠীরাও কান্নায় ভেঙে পড়ে। তাদের দাবি, ‘রামিসাকে কখনও ভোলা যাবে না। খুনির দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।’

এদিকে এ হত্যাকাণ্ডে ক্ষোভে ফুঁসছে পল্লবী-মিরপুরসহ পুরো দেশ। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছেন। সহপাঠী, শিক্ষক, এলাকাবাসী— সবাই দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা নাজির শাহ আহমেদ অভিযোগ করেন, ভবনটির মালিক বিদেশে থাকেন। ওই মালিকের এ এলাকায় তিনটি বাড়ি রয়েছে। বাড়িটি এখন অনেকটা মেসে পরিণত হয়েছে।

তার অভিযোগ, বাড়ির কেয়ারটেকার বিভিন্ন রিকশাচালক ও শ্রমজীবী মানুষকে ভাড়া দিয়েছেন এবং ভবনের ভেতরে মাদকের আসরও বসে। এতে এলাকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছিল বলে দাবি করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, গত মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে রাজধানীর পল্লবীর একটি বাসা থেকে শিশু রামিসা আক্তারের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। পরে মামলার প্রধান আসামি জাকির হোসেন ওরফে সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বর্তমানে হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪