আন্তর্জাতিক ডেস্ক: কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মতিতে হওয়া যৌনসম্পর্ককে অপরাধের আওতার বাইরে আনতে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে নেপাল সরকার। ১৮ বছরের কম বয়সীদের সম্মতিসূচক শারীরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শাস্তি লঘু করা বা মামলা থেকে অব্যাহতির বিধান রেখে নতুন আইন প্রণয়নের আলোচনা চলছে দেশটিতে।
নেপালের বর্তমান আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী যেকোনো কিশোর বা কিশোরীর মধ্যে যৌনসম্পর্ককে ‘ধর্ষণ’ হিসেবে গণ্য করা হয়। এ ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মতির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয় না। ফলে উভয় পক্ষের সম্মতি থাকলেও আইনের চোখে সেটি অপরাধ হিসেবেই বিবেচিত হয়।
বিশেষ করে ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে এই আইন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনা রয়েছে। কারণ, নেপালে ১৮ বছর বয়সে একজনকে সাবালক হিসেবে গণ্য করা হলেও বৈধ বিয়ের বয়স নির্ধারিত ২০ বছর। এতে আইনি অসঙ্গতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞ ও তরুণদের একটি অংশ।
সমালোচকদের দাবি, বিদ্যমান আইনটি নাবালকদের সুরক্ষার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মতিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করছে। এর ফলে বহু কিশোর বা তরুণ শুধুমাত্র সম্পর্কে জড়ানোর কারণে দীর্ঘ সময় কারাভোগ করছেন।
এই প্রেক্ষাপটে নেপালের সরকার বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচনা শুরু করেছে। দেশটির আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে গঠিত একটি টাস্কফোর্স সুপ্রিম কোর্ট ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে সংশোধনী প্রস্তাব প্রস্তুত করেছে। বর্তমানে প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভা পর্যায়ে পর্যালোচনায় রয়েছে।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে বলা হয়েছে, যদি সম্পর্কে জড়িত উভয়ের বয়স ১৬ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে হয় এবং বয়সের পার্থক্য নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকে, তবে তাদের পারস্পরিক সম্মতিকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হবে। এ ধরনের সম্পর্ককে আর ‘ধর্ষণ’ হিসেবে গণ্য করা হবে না। আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ‘রোমিও-জুলিয়েট’ ধাঁচের আইনি ছাড় অনুসরণ করেই এই বিধান আনার চিন্তা করছে নেপাল।
তবে এই ছাড় সব ধরনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। প্রস্তাবিত আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে—যদি সম্পর্কে জোরজবরদস্তি, ব্ল্যাকমেল, ক্ষমতার অপব্যবহার বা আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে শোষণের অভিযোগ থাকে, তাহলে তা অপরাধ হিসেবেই বিবেচিত হবে। শুধুমাত্র সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় গড়ে ওঠা সম্পর্কের ক্ষেত্রেই আইনি সুরক্ষা মিলবে।
সরকারি টাস্কফোর্সের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে পরিবারগুলো নিজেদের অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের সম্পর্ক মেনে না নিয়ে ছেলেদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করে থাকে। বিশেষ করে আন্তঃবর্ণ বা ভিন্ন জাতের মধ্যে প্রেম ও বিয়ের ঘটনায় এমন প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
টাস্কফোর্সের মতে, বিদ্যমান আইনকে ব্যবহার করে পারস্পরিক সম্মতিসূচক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ফৌজদারি মামলা করা হচ্ছে, যা অনেক সময় সামাজিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
নতুন আইন প্রণয়নে জাতিসংঘের শিশু অধিকার কমিটির আন্তর্জাতিক নির্দেশিকাও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। ওই নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, সমবয়সি কিশোর-কিশোরীদের পারস্পরিক সম্মতির সম্পর্ককে আলাদাভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে প্রাপ্তবয়স্ক ও নাবালকের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্মতির কোনো আইনি বৈধতা থাকবে না।
নেপাল সরকার জানিয়েছে, নতুন আইনেও প্রাপ্তবয়স্ক কোনো ব্যক্তি যদি নাবালকের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান, তাহলে তা আগের মতোই কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। একইভাবে, সমবয়সি কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রেও যদি জোরপূর্বক সম্পর্কের অভিযোগ ওঠে, তাহলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রিপোর্টার্স২৪/বাবি