রিপোর্টার্স ডেস্ক: শরীফ ওসমান হাদিকে ইঙ্গিত করে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। হত্যাকারীর নাম গোপন করতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ফোন করে চাপ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। নির্বাচনে হারের পর মঙ্গলবার (২ জুন) প্রথমবার রাজনৈতিক কর্মসূচিতে এ দাবি করেন তৃণমূল নেত্রী।
বিধানসভার নির্বাচনে পরাজয়ের প্রায় এক মাস পর প্রথম রাজনৈতিক কর্মসূচিতেই বিস্ফোরক মমতা। কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে চাপে রাখতে রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে নাম না করে বাংলাদেশের ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি হত্যা প্রসঙ্গ টেনে এনে বিস্ফোরক দাবি করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
ভোট পরবর্তী অশান্তি, পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ, নিট পরীক্ষার জালিয়াতি ও বিজেপি সরকারের প্রতিহিংসামূলক আচরণের প্রতিবাদে মঙ্গলবার কলকাতার প্রাণকেন্দ্র ধর্মতলার ‘ওয়াই চ্যানেল’-এ এই ধরনা কর্মসূচিতে বসেন মমতা।
এদিনের রাজনৈতিক সভা থেকে হঠাৎ করেই বাংলাদেশের ইনকিলাব মঞ্চের আহবায়ক ওসমান হাদি হত্যার বিষয়টিও তুলে ধরেন মমতা। মমতার দাবি, হাদি হত্যাকারীদের রাজ্য পুলিশের এসটিএফ গ্রেপ্তার করার পর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ফোন পান মমতা। তাকে বলা হয় এই বিষয়টি যেন বাইরে না জানানো হয়।
মমতা বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে একটা বড় খুনিকে রাজ্য পুলিশের এসটিএফ গ্রেপ্তার করেছিল। যা নিয়ে বাংলাদেশে অনেক আন্দোলন হয়েছিল। অন্য দেশের কথা আমি বলছি না। আমার অধিকারও নেই বলার। কিন্তু আমি যেটা বলতে চাইছে তা হলো ওই হত্যাকারীরা মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসে। বাংলায় আসার পর আমাদের এসটিএফ তাদের ধরে। এইটা তাদের কৃতিত্ব। কিন্তু তারপর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজে আমাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন, আপনি রাজ্য পুলিশকে জানিয়ে দিন এটা যেন বাইরে না যায়। কারণ এটা দেশের ব্যাপার।’
অমিত শাহকে মমতার প্রশ্ন, ‘কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়ে ছিল? আজকের সরকার পরিবর্তন হলেও আমি সবটাই জানি। আমার হৃদয়টাই একটা কথার ভান্ডার। তথ্য ভান্ডার।’
তার অভিমত, ‘এতদিন আমি বলিনি। কিন্তু আজকে অত্যাচারে শেষ সীমায় গেছে বলে আমাকে মুখ খুলতে হয়েছে। আমি সেই নামটা বলতে চাইছি না, বললে বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে যাবে। আমি বাংলাদেশকে ভালবাসি। দেশের স্বার্থে ওই নাম আমি বলব না।’
মিশনারি অব চারিটিস তহবিল বন্ধ করে দেয়া নিয়েও এদিন সোচ্চার হয়েছেন মমতা। মূলত বিধানসভা নির্বাচনের পর বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভাঙ্গনের মুখে দাঁড়িয়ে আছে মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেস। মোট ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৬০ জনের বিদ্রোহী হিসাবে চিহ্নিত হয়েছেন। মঙ্গলবারেও মমতার ধর্না কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ৬ জন বিধায়ক। এমন অবস্থায় বিজেপিকে নিশানা করেছেন দলনেত্রী এবং সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। তার অভিযোগ, ‘দিল্লি থেকে কলকাঠি নাড়িয়ে তৃণমূলকে ভেঙে দেয়ার চক্রান্ত চলছে। বেআইনিভাবে পুলিশ দিয়ে আমাদের দলের বিধায়ক কাউন্সিলরদের ভয় দেখানো হচ্ছে। যদিও সেই প্রচেষ্টা কোনভাবেই সফল হবে না।’
কেন্দ্রকে নিশানা করে মমতা বলেন, 'আমাকে কতবার বলা হয়েছিল, আপনি কি চান, সব কিছু দেব। কিন্তু আমাদের দলের একটা নীতি আছে, আদর্শ আছে, দর্শন আছে। আজকে আমার একটাই দুঃখ, যাদের জন্য সারা জীবন করেছি, তারাই আজ গদ্দারের সাথে লাইন দিয়েছে। যারা আজকে তৃণমূলকে ভাঙ্গার জন্য গাদ্দারী করছে, আমি বলব সবাইকে ভগবান যেন সুমতি দেন। যদি কোনদিন ভালো কাজ করে থাকি, সেটা মেনে চলব।’
এদিনের ধরনা কর্মসূচি শুরু করার আগে তিনি রেড রোডে অবস্থিত ভারতীয় সংবিধানের রচয়িতা বি আর আম্বেদকর এবং জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর মূর্তিতে শ্রদ্ধা জানান। এরপর সেখান থেকে চলে আসেন ওয়াই চ্যানেলে। তবে তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে পোস্ট করে দলের নেতাকর্মীদের সমাবেশে যোগ দেয়ার আহ্বান জানানো হলেও বিধায়ক ও সাংসদদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়নি।
সদ্য শেষ হওয়ার রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনে ৮০ আসনে জয় পেয়েছিলেন তৃণমূল। এর মধ্যে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে সোমবারই দুই বিধায়ককে বহিষ্কার করে তৃণমূল। ফলে ৭৮ জন বিধায়কের মধ্যে মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন বিধায়ক, সাংসদ, কাউন্সিলর ও পরাজিত বিধায়কদের দেখা গেল এদিনের কর্মসূচিতে। এদের মধ্যে অন্যতম বিধায়ক কুনাল ঘোষ, শোভন দেব চট্টোপাধ্যায়, মদন মিত্র, অশোক দেব, নয়না ব্যানার্জি, সাংসদ কল্যাণ ব্যানার্জি, দোলা সেন। দলনেত্রীর নির্দেশ সত্বেও কার্যত ছন্নছাড়া অবস্থা তৃণমূলের এই ধারণা কর্মসূচির চেহারা।
এ নিয়ে কটাক্ষ করতে ছাড়েননি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও রাজ্যের ক্যাবিনেট মন্ত্রী তাপস রায়।শুভেন্দু বলেন, ‘এত দুরবস্থা জানতাম না। দেড়শটা লোকও আসেনি। আপনারা ২০০ জন সাংবাদিক না থাকলে আরো করুন অবস্থা হয়ে যেত।’
রাজ্যের ক্যাবিনেট মন্ত্রী এবং একসময় তৃণমূল করে আসা রাজনীতিবিদ তাপস রায় জানিয়েছেন, ‘খুবই দুর্ভাগ্যজনক। সেই কারণে ক্ষমতায় থাকলে দম্ভ, অহংকার দেখাতে নেই। অহংকারটা আকাশ ছোঁয়া হয়ে গিয়েছিল।’
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, তৃণমূলের অন্দরের বিদ্রোহ কি আরো চওড়া হচ্ছে? কারণ মঙ্গলবারও কলকাতার কর্পোরেশনের কাউন্সিলার পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন তারক সিং।
এরকম এক আবহে জল্পনা আরো বাড়িয়েছে রাজ্যের তাপস রায়'এর একটি পোস্টকে ঘিরে। ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, ‘তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙে চুরমার। মহারাষ্ট্রের মতো অবস্থা হলো তৃণমূলের। বিধানসভার স্পিকারের কাছে প্রায় ৫০ জন তৃণমূল বিধায়ক নিয়ে পৌঁছে গেছে ঋতব্রত ব্যানার্জি। খেলা হবে।’
এনিয়ে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তাপস রায় বলেন, ‘তৃণমূল দুটো ভাগে ভাগ হয়েছে। একদিকে মমতাকে অস্বীকার করছে, অন্যদিকে অভিষেককে অস্বীকার করছে। এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এটা অনিবার্য ছিল, এটা হওয়ারই ছিল। এটা হবে। তার কারণ তৃণমূল দলটা অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব গায়ক-গায়িকা নায়ক নায়িকাদের নিয়ে গঠিত। একটা বাংলার দল অথচ সর্বভারতীয় দল হিসেবে দেখাতে গিয়ে গুজরাট, দিল্লি, বিহার সহ বিভিন্ন জায়গা থেকে অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়ে এসে রাজ্যসভা ও লোকসভায় পাঠানো হতো।’
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব