টাঙ্গাইল প্রতিনিধি: গারো ভাষায় ‘দক’ অর্থ শরীর আর ‘মান্দা’ অর্থ কাপড় বা শাড়ি। এই দুই শব্দের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে ‘দকমান্দা’—যা শুধু একটি পোশাক নয়, বরং গারো জনগোষ্ঠীর হাজার বছরের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক।
টাঙ্গাইলের মধুপুর, ঘাটাইল ও সখীপুরের শালবন ঘেরা জনপদে একসময় সামাজিক উৎসব, বিয়ে কিংবা ওয়ানগালা অনুষ্ঠানে নারীরা একই রঙের দকমান্দা পরে অংশ নিতেন। রঙের ঐক্য ও নকশার বৈচিত্র্যে ফুটে উঠত গারো সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য। তবে আধুনিকতার আগ্রাসন, পরিবর্তিত জীবনযাত্রা এবং যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে এই ঐতিহ্যবাহী পোশাক আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একটি দকমান্দা তৈরি করতে প্রয়োজন হয় নিখুঁত বুননশৈলী, ধৈর্য ও দীর্ঘ সময়। গারো নারীরা কাঠের তৈরি আদি তাঁতযন্ত্র ‘কোঁক’-এর সাহায্যে ঘরে বসেই এটি তৈরি করেন। দকমান্দার প্রধান বৈশিষ্ট্য এর পাড়জুড়ে রঙিন সুতা দিয়ে বোনা ফুল, লতা-পাতা ও জ্যামিতিক নকশা, যেখানে পাহাড়ি প্রকৃতির সৌন্দর্য ফুটে ওঠে।
একটি আকর্ষণীয় দকমান্দা তৈরি করতে এক থেকে দুই সপ্তাহ, আর জটিল নকশার ক্ষেত্রে এক মাস পর্যন্ত সময় লাগে। হাতে তৈরি হওয়ায় এর উৎপাদন ব্যয়ও তুলনামূলক বেশি। বর্তমানে সুতা, রঙ ও অন্যান্য উপকরণের দাম বৃদ্ধির কারণে একটি সাধারণ দকমান্দা ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকায় এবং নকশাভেদে উন্নত মানের দকমান্দা ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বা তারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, গারো জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত হওয়ায় এই দামে নিয়মিত দকমান্দা কেনা সম্ভব হয় না। অন্যদিকে মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে প্রকৃত কারিগররা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সহজলভ্য ও কম দামের আধুনিক পোশাকের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে দকমান্দা।
মধুপুর উপজেলার গায়রা এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, এখনো অনেক গারো নারী মাঠে কাজ করার সময়ও স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে দকমান্দা পরেন। তাদের কাছে এটি কেবল পোশাক নয়, বরং নিজেদের পরিচয় বহনকারী একটি ঐতিহ্য।
গায়রা এলাকার গারো কিশোরী বাপ্পি বেডুলকার বলেন, “দকমান্দা আমাদের ঐতিহ্যের পোশাক। ছোটবেলা থেকেই মা-নানিদের দেখে এটি পরা শিখেছি। এটি পরতে আমাদের খুব ভালো লাগে।”
তিনি বলেন, “এক প্যাঁচে পরা এই পোশাকে মাঠের কাজ কিংবা ঘরের কাজ করতে কোনো অসুবিধা হয় না। শরীরের সঙ্গে এমনভাবে মানিয়ে যায় যে আলাদা কোনো ভারী পোশাক পরার অনুভূতি হয় না।”
তবে বাপ্পি ও তার সমবয়সী কিশোরীদের আক্ষেপ, আধুনিকতার প্রভাবে অনেক তরুণ-তরুণী এখন আর দকমান্দা নিয়মিত পরতে চান না। বাইরে বা শহরে এই পোশাক পরে গেলে অনেক সময় কৌতূহলী ও বিব্রতকর প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণেও অনেকেই পছন্দের দকমান্দা কিনতে পারেন না।
গারো সম্প্রদায়ের সদস্য অঞ্জনা নকরেক বলেন, “দকমান্দার নকশা ও রঙে আমাদের পাহাড়ি জীবন ও সংস্কৃতির ছাপ রয়েছে। জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন—বিয়েতেও গারো কনেদের প্রথম পছন্দ দকমান্দাই। এটি আমাদের গর্ব ও ঐতিহ্যের প্রতীক।”
মধুপুরের আচিক মিচিক সোসাইটির পরিচালক সুলেখা ম্রং বলেন, “গারো সমাজে দকমান্দা শুধু পোশাক নয়, এটি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম বাহন। কর্মসংস্থান, আধুনিক জীবনযাত্রা ও মূলধারার সমাজের সঙ্গে মিশে যাওয়ার কারণে নতুন প্রজন্মের মধ্যে এর ব্যবহার কমছে। তবে ভাষা ও পোশাকই আমাদের অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় পরিচয়। তাই দকমান্দাকে টিকিয়ে রাখা মানে নিজেদের শিকড় ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা।”
সংস্কৃতিবিদদের মতে, দকমান্দা সংরক্ষণে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ, কারিগরদের প্রশিক্ষণ, বাজার সম্প্রসারণ এবং নতুন প্রজন্মকে ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। তা না হলে সময়ের স্রোতে হারিয়ে যেতে পারে গারো জনগোষ্ঠীর এই অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।
রিপোর্টার্স২৪/এসএন