| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

ফুটবলে মগ্ন কারা স্টাফরা, ১৬ ফুট উঁচু প্রাচীর টপকে যেভাবে পালালেন নারী বন্দি

reporter
  • আপডেট টাইম: Jul ১৮, ২০২৬ ইং | ২২:৪৪:১৬:অপরাহ্ন  |  ১৬৮৮ বার পঠিত
ফুটবলে মগ্ন কারা স্টাফরা, ১৬ ফুট উঁচু প্রাচীর টপকে যেভাবে পালালেন নারী বন্দি

স্টাফ রিপোর্টার: ফিফা বিশ্বকাপের জ্বরে কাঁপছে সারা দেশ। সেই উন্মাদনায় মেতে ফ্লাডলাইট জ্বালিয়ে ফুটবল খেলায় মেতে উঠেছিলেন কাশিমপুর নারী কেন্দ্রীয় কারাগারের একদল কারা স্টাফ।

একই সময়ে উঁচু ওয়াচ টাওয়ারে দায়িত্বে থাকা কয়েকজন কারারক্ষীও সেই খেলা দেখায় মগ্ন ছিলেন। নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এই শিথিলতার ফাঁক গলেই প্রায় ১৬ ফুট উঁচু কারা প্রাচীর টপকে পালিয়ে গেছেন চুরির মামলায় তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত নারী বন্দি রিম্পা (২১)।

দেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো নারী বন্দির কারা প্রাচীর টপকে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটল। গত বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) গাজীপুরের কাশিমপুর নারী কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে পালিয়ে যান তিনি। শনিবার (১৮ জুলাই) রাত পর্যন্ত তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। এ ঘটনায় শুক্রবার (১৭ ‍জুলাই) কোনাবাড়ী থানায় মামলা করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তিন ম্যাট্রন (নারী তত্ত্বাবধায়ক) ও চার নারী কারারক্ষীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

শনিবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে গাজীপুর কোনাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইফতেখার হোসেন বলেন, নারী বন্দি পালানোর ঘটনায় কারা কর্তৃপক্ষ মামলা করেছে। মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, কারা প্রাচীর টপকেই তিনি পালিয়ে যান। তিনি একজন ভাসমান নারী। কোনো মোবাইল ফোনও ব্যবহার করেন না। তারপরও তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

কারাগারের একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, রিম্পা পালিয়ে যাওয়ার সময় ফ্লাডলাইটের আলোয় কারা স্টাফদের ফুটবল খেলা চলছিল। একই সময়ে উঁচু স্থানে দায়িত্বে থাকা কয়েকজন কারারক্ষীও খেলা দেখছিলেন। নিরাপত্তা ব্যবস্থার সেই ফাঁকই কাজে লাগান রিম্পা।

সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার বন্দিদের গুনতির সময় সংখ্যা না মেলায় রিম্পার উধাও হওয়ার বিষয়টি প্রথম ধরা পড়ে। পরে পুরো নারী কারাগারসহ কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারজুড়ে ব্যাপক তল্লাশি চালানো হয়। প্রায় ১০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিভিন্ন ভবন, গোডাউন, এমনকি স্যুয়ারেজ লাইন পর্যন্ত খুঁজেও তার কোনো সন্ধান পাননি।

কারা সূত্র বলছে, চুরির মামলায় তিন মাসের সাজাপ্রাপ্ত রিম্পা কারা বিধি অনুযায়ী কয়েদি শাড়ি পরতেন এবং সেখানে সুইপারের দায়িত্ব পালন করতেন। তার কাছে ‘কামপাশ’ বা কাজের অনুমতিপত্র ছিল। ফলে নারী কারাগারের বিভিন্ন অংশে তার অবাধ যাতায়াতের সুযোগ ছিল।

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যার পর নারী কারাগারের গোডাউনের পাশের প্রায় ১৬ ফুট উঁচু দেয়াল বেয়ে তিনি জেলারের কোয়ার্টারের দ্বিতীয় তলার ছাদে উঠে যান। এরপর একটি ছেঁড়া ডিশ লাইনের তার ব্যবহার করে কারাগারের বাইরের দিকে নেমে যান। দেয়ালের বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের সরু অংশ ধরে ওপরে ওঠার আলামতও পাওয়া গেছে।

সিসিটিভি ফুটেজে পুরো দৃশ্য স্পষ্ট না হলেও একটি হাত দেয়াল বেয়ে ওপরে উঠতে দেখা গেছে। ঘটনাস্থলের নিচে পাওয়া গেছে তার স্যান্ডেল ও খুলে রাখা কয়েদি শাড়ি। অপর পাশে উদ্ধার হয়েছে একটি ছেঁড়া ডিশ লাইনের তার।

কারাগারের সূত্র বলছে, জেলারের কোয়ার্টারের ছাদ থেকে ডিশ লাইনের তার ব্যবহার করে পালানোর বিষয়টি এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কারণ ওই পথ দিয়ে বের হওয়া অত্যন্ত কঠিন। আবার কেন্দ্রীয় আরপি গেট দিয়েও তিনি বেরিয়ে গেছেন—এমন কোনো সিসিটিভি ফুটেজও মেলেনি।

অবশ্য কারা কর্মকর্তাদের কোয়ার্টারে অনেক নারী গৃহকর্মী কাজ করেন। তারা আরপি গেট দিয়ে প্রবেশ করেন এবং আবার বেরিয়েও যান। সূত্রটি বলছে, কোয়ার্টারে কর্মরত কোনো গৃহকর্মীর ছদ্মবেশে তিনি আরপি গেট দিয়ে বেরিয়ে গেছেন কি না, সেটিও তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে ম্যাট্রনদের (নারী তত্ত্বাবধায়ক) তদারকিতে ঘাটতির সুযোগেই রিম্পা পালাতে সক্ষম হয়েছেন বলে কর্মকর্তারা মনে করছেন।

কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার আনুমানিক ১০০ একরের বেশি জায়গাজুড়ে অবস্থিত। পুরো কারাগারই সীমানাপ্রাচীর দিয়ে ঘেরা এবং সেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। এই প্রাচীরের ভেতরে চারটি পৃথক কারাগার রয়েছে। এর মধ্যে একটি নারী কারাগার, যার আয়তন প্রায় ৬-৭ একরের বেশি জায়গায়। নারী কারাগারের ভেতরে সাধারণ বন্দিদের থাকার জন্য চারতলা ভবন রয়েছে। সেখানেই থাকতেন রিম্পা। এ ছাড়া নারী কারাগারে বন্দিদের রাখার জন্য ‘ডিভিশন ভবন’, ‘গোডাউন’সহ আরও কয়েকটি ভবন রয়েছে।

কারা নথিতে রিম্পার বাড়ি মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে তিনি একজন ভাসমান নারী। কখনো ঢাকার কারওয়ান বাজার বস্তি, আবার কখনো মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় বসবাস করতেন।

শনিবার (১৮ জুলাই) কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) ও মুখপাত্র জান্নাত-উল-ফারহাদ বলেন, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ম্যাট্রন লায়লা আনজুমান, মেরিনা, রেহেনা এবং নারী কারারক্ষী শায়লা, শারমিন, জেমি ও আসমা খাতুনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি একজন সিনিয়র জেল সুপারকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কারা সূত্র বলছে, দেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো নারী বন্দির কারা প্রাচীর টপকে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটল। এর আগে হাসপাতাল থেকে পাহারার ফাঁক গলে নারী বন্দির পালানোর ঘটনা ঘটেছিল। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় কারাগারের প্রধান ফটক ভেঙে কিছু নারী বন্দি পালিয়ে যাওয়ার নজির থাকলেও প্রাচীর টপকে পালানোর ঘটনা ঘটেনি।

কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের মধ্যে এখনো প্রায় ৭০০ জন পলাতক। তবে নারী বন্দির এ ধরনের পালানোর ঘটনা কারা নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪