রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: উন্নত জীবনের স্বপ্ন, বিদেশে চাকরির প্রলোভন এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণার জালে পড়ে মানবপাচারের অন্যতম বড় উৎস দেশে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপের ইতালি ও গ্রিসে প্রবেশের চেষ্টায় বাংলাদেশিরা এখন শীর্ষে অবস্থান করছে। একই সঙ্গে কম্বোডিয়া, মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশে চাকরির নামে সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে আটকে পড়া, রাশিয়ার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ এবং নারী পাচারের ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক মানবপাচারবিরোধী দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য ও গবেষণায় উঠে এসেছে মানবপাচারের এই ভয়াবহ চিত্র।
ইউরোপীয় সীমান্তরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্যের বরাত দিয়ে ব্র্যাক জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ২০ হাজার ২৫৯ জন বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই একই পথে ইতালিতে পৌঁছেছেন ৪ হাজার ২৪৯ জন এবং লিবিয়া থেকে গ্রিসে গেছেন আরও ৩ হাজার ৬০৮ জন বাংলাদেশি। ফলে ইতালির পাশাপাশি গ্রিসগামী অনিয়মিত অভিবাসীদের তালিকাতেও বাংলাদেশ এখন শীর্ষে রয়েছে।
ইউরোপে যাওয়ার এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে প্রাণহানি ও নির্যাতনের ঘটনাও বেড়েছে। চলতি বছরের মার্চে লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে অন্তত ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। অভিযোগ রয়েছে, লিবিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্পে আটকে রেখে অসংখ্য বাংলাদেশিকে নির্যাতন, মুক্তিপণের জন্য জিম্মি এবং পরিবারের কাছ থেকে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, অনিয়মিতভাবে ইউরোপে যাওয়া ব্যক্তিদের বেশিরভাগের বয়স ২৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। মাদারীপুর, শরীয়তপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জসহ অন্তত ১০ থেকে ১২ জেলার মানুষ এ পথে বেশি যাচ্ছেন।
পাচারকারীরা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম ব্যবহার করে ইতালিতে পৌঁছানোর গল্প, নৌযাত্রার ছবি ও সফলতার মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে নতুন মানুষ সংগ্রহ করছে।
মানবপাচারের পাশাপাশি নতুন সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে বিদেশে সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে বাংলাদেশিদের আটকে রেখে প্রতারণামূলক কাজে বাধ্য করা।
চাকরির আশ্বাস দিয়ে বাংলাদেশিদের কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, লাওস, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের বিভিন্ন স্ক্যাম সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ব্র্যাকের গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশে নেওয়া ব্যক্তিদের ৯৮ শতাংশই প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি। প্রায় ৯০ শতাংশকে জোরপূর্বক প্রতারণামূলক কাজে যুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া ৮৮ শতাংশের চলাফেরায় নিয়ন্ত্রণ ছিল, ৮৬ শতাংশের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয় এবং অনেকেই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে ১৫ হাজার ৯২১ বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে কম্বোডিয়ায় গেছেন। তবে সাম্প্রতিক অভিযানে সেখানকার স্ক্যাম সেন্টার থেকে উদ্ধার হয়ে শুধু জুন মাসেই দেশে ফিরেছেন ৫৮৩ জন বাংলাদেশি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বৈধ চাকরির কথা বলে তাদের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে ভিজিট ভিসায় বিদেশে নিয়ে গিয়ে পাসপোর্ট জব্দ করে স্ক্যাম কম্পাউন্ডে বিক্রি করে দেওয়া হয়। প্রতারণার নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে মারধর, বৈদ্যুতিক শক ও টর্চার সেলে নির্যাতনের ঘটনাও ঘটেছে।
সাইবার প্রতারণার পাশাপাশি রাশিয়ায় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগও সামনে এসেছে। নিরাপত্তারক্ষী, নির্মাণশ্রমিক বা ওয়েল্ডারের চাকরির কথা বলে অনেককে বৈধ ভিসায় রাশিয়ায় নেওয়ার পর সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তদন্তে এসব অভিযোগ উঠে এসেছে। এ পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্যও সামনে এসেছে।
নারী পাচারের ঘটনাও কমছে না। গৃহকর্মী, পোশাক কারখানা বা বিউটি পার্লারে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অনেক নারীকে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ায় নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক যৌন শোষণ বা অনৈতিক কাজে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রেও মানবপাচার অব্যাহত রয়েছে। কক্সবাজার ও টেকনাফ উপকূল ব্যবহার করে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশিদের মালয়েশিয়ায় পাচারের ঘটনা থামছে না। গত আট বছরে সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হলেও সক্রিয় রয়েছে পাচারচক্র।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের পর অনেককেই সাগরপথে পাচার করা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত মানবপাচারসংক্রান্ত মোট ৫ হাজার ২৮৪টি মামলা বিচার বা তদন্তাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩০৬টি মামলা বিচারাধীন এবং ১ হাজার ৯৭৮টির তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে নতুন করে ৫০০টির বেশি মামলা হলেও নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৭টি। এ পরিস্থিতিতে সরকার ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। নতুন আইনে অভিবাসী চোরাচালানকে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সংঘবদ্ধ মানবপাচারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ডের বিধান বহাল রাখা হয়েছে।
তবে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান মনে করেন, শুধু কঠোর আইন করলেই এ সমস্যার সমাধান হবে না। পাচারচক্রের মূল হোতাদের বিচারের আওতায় আনা, তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, প্রযুক্তিনির্ভর মানবপাচার মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানো, মানবপাচারপ্রবণ এলাকায় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম