আশিস গুপ্ত, নয়াদিল্লি: আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল গত ২৯ জুলাই ভারতকে গাজায় সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সতর্কতা সত্ত্বেও ইসরায়েলে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ চালিয়ে যাওয়ার জন্য কঠোরভাবে অভিযুক্ত করেছে।
‘মেড ইন ইন্ডিয়া: দ্য সাপ্লাই অব ওয়েপনস অ্যান্ড অ্যামিউনিশন টু ইসরায়েল’ শীর্ষক ৪২ পৃষ্ঠার এক বিশদ প্রতিবেদনে সংস্থাটি দাবি করেছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর থেকে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ভারত থেকে ইসরায়েলে ২,৫৯৬টি সামরিক চালান পাঠানো হয়েছে। এসব চালানের মাধ্যমে ভারত ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সরবরাহ শৃঙ্খলে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যা গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযান ও সম্ভাব্য গণহত্যাকে প্রত্যক্ষ রূপ দিচ্ছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে ইসরায়েলে অন্ততঃ ৩,৯০,৫১৬টি ক্ষুদ্র অস্ত্রের যন্ত্রাংশ, ড্রোন ওয়ারহেড ও কামানের গোলা সহ ৫,৬৪,৯৭০টি বিস্ফোরক উপাদান এবং ২৯৮টি সামরিক যানবাহনের যন্ত্রাংশ রপ্তানি করা হয়েছে। বিশ্বের বহু দেশ আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতার মুখে ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহ স্থগিত করলেও ভারতের ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
গাজায় ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা ৭৩,০০০ ছাড়িয়েছে এবং ১৭৩,৫০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। এই ব্যাপক প্রাণহানির পটভূমিতেও ভারতের অন্তত নয়টি প্রতিষ্ঠান—যার মধ্যে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সরাসরি মালিকানাধীন তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাও রয়েছে—ইসরায়েলে অস্ত্র ও প্রযুক্তি সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। অ্যামনেস্টি নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘মুনিশন্স ইন্ডিয়া লিমিটেড’ ১,০০০টি ১৫৫-মিমি গোলা, ‘অ্যাডভান্সড ওয়েপনস অ্যান্ড ইকুইপমেন্ট ইন্ডিয়া লিমিটেড’ ১২০টি ৮১-মিমি মর্টার লঞ্চার এবং ‘ইন্ডিয়া অপটেল লিমিটেড’ ১৭৮টি সেমিকন্ডাক্টর ও অপটিক্যাল সেন্সর ইসরায়েলি সংস্থাগুলিতে পাঠিয়েছে।
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সাত বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চের নির্দেশিত আইনি নীতির ভিত্তিতে অ্যামনেস্টি যুক্তি দিয়েছে, এই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলি সম্পূর্ণভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও অর্থায়নে পরিচালিত হওয়ায় এদের এই অস্ত্র সরবরাহ সরাসরি ভারতীয় রাষ্ট্রের কার্যপ্রণালী হিসেবেই গণ্য হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ভারতের বেসরকারি খাতও বিপুল পরিমাণে সামরিক উপাদান রপ্তানি করেছে। আদানি গ্রুপের যৌথ উদ্যোগ ‘পিএলআর সিস্টেমস’ ১০,৫৭১টি নেগেভ মেশিনগানের যন্ত্রাংশ, ‘ইন্দো-এমআইএম’ প্রায় ৫৯,৬৩৭টি স্বয়ংক্রিয় ফায়ারিং উপাদান এবং ভারত ফোর্জের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘কল্যাণী স্ট্র্যাটেজিক সিস্টেমস’ ৯,৬০০টি কামানের গোলার খোলস পাঠিয়েছে।
এছাড়া ‘আলফা এলসেক’ নামক অপর একটি সংস্থা ৫ কেজি ওজনের 'স্কাই স্ট্রাইকার' ড্রোন ওয়ারহেড সরবরাহ করেছে, যা পরবর্তীতে গাজার খান ইউনিস সহ বিভিন্ন জায়গায় ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে। প্রতিবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের গণহত্যা প্রতিরোধ সংক্রান্ত একাধিক অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের প্রস্তাব সত্ত্বেও ভারত এসব রপ্তানি স্থগিত করেনি।
ভারত জাতিসংঘের একাধিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত প্রস্তাবে ভোট দানে বিরত থেকে বৈশ্বিক মানবাধিকার কাঠামোর প্রতি উদাসীনতা প্রদর্শন করেছে। ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফরেন ট্রেড এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির মাধ্যমে এই ধরনের নিয়ন্ত্রিত সামরিক সামগ্রী রপ্তানির লাইসেন্স অনুমোদন করা হয়। ফলে আন্তর্জাতিক চুক্তি যেমন জেনেভা কনভেনশন ও গণহত্যা প্রতিরোধ কনভেনশনের আইনি ঝুঁকি জানা সত্ত্বেও ভারত সরকার জেনেশুনেই এসব বাণিজ্য চালিয়েছে। এই চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রেক্ষাপটে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ভারত সরকারের প্রতি ইসরায়েলে অবিলম্বে সমস্ত সামরিক ও দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য সরঞ্জাম সরবরাহ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে।
পাশাপাশি সংস্থাটি এই নয়টি ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য ফৌজদারি দায়িত্ব তদন্তের জন্য নির্দেশ দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র বাণিজ্য চুক্তিতে ভারতের অন্তর্ভুক্তির দাবি জানিয়েছে। যদিও ভারত সম্প্রতি জাতিসংঘে ফিলিস্তিনকে মানবিক সহায়তা প্রদান এবং দ্বিপাক্ষিক সমাধান নীতির কথা বারবার পুনর্ব্যক্ত করছে, বাস্তব ক্ষেত্রে তাদের অস্ত্র সরবরাহ সংক্রান্ত এই ভূমিকা ভারতের পররাষ্ট্রনীতির চরম বৈপরীত্য ও বৈশ্বিক জবাবদিহিতার ঘাটতিকেই স্পষ্টভাবে উন্মোচিত করে।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব