| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

ভূ-রাজনীতির অশনি সংকেত: অন্যের জোট ও সংঘাতে বাংলাদেশের জড়িয়ে পড়ার বিপদ

reporter
  • আপডেট টাইম: অগাস্ট ৩১, ২০২৬ ইং | ২০:৪৭:৩০:অপরাহ্ন  |  ২৩৬ বার পঠিত
ভূ-রাজনীতির অশনি সংকেত: অন্যের জোট ও সংঘাতে বাংলাদেশের জড়িয়ে পড়ার বিপদ

নোমান হাসান: ভূ-রাজনীতিতে একটি পুরনো প্রবাদ আছে—মিত্রতা যত দ্রুত গড়ে ওঠে, তার মূল্য তত বেশি হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এই সত্যের সবচেয়ে স্পষ্ট দৃষ্টান্ত পাকিস্তান। কৌশলগত স্বার্থে প্রক্সি শক্তি লালন করার যে পথ দেশটি দশকের পর দশক ধরে বেছে নিয়েছে, তার ফল আজ পাকিস্তানকেই ভোগ করতে হচ্ছে। নিজের সীমান্তে সংঘাত, নিজের ভূখণ্ডে বিদ্রোহ এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা সেই পরিণতিরই অংশ। বাংলাদেশ যখন আজ তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে সম্পর্কের পরিসর বাড়াচ্ছে এবং আঞ্চলিক সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনা খুঁজছে, তখন পাকিস্তানের এই অভিজ্ঞতা থেকে একটি শিক্ষা নেওয়া জরুরি।

নতুন সম্পর্কের দরজা খোলা কূটনীতির স্বাভাবিক অংশ। তবে এটাও বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে, নিরাপত্তা ও কৌশলগত ক্ষেত্রে দ্রুত এবং গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা নতুন ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকেই পাকিস্তান তার নিরাপত্তানীতিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবেশীদের মোকাবিলায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করার নীতি অনুসরণ করেছে। আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী মুজাহিদিনদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দেওয়ার মাধ্যমে সেই নীতির বড় উদাহরণ তৈরি হয়। ভারতের ক্ষেত্রেও পাকিস্তান এমন কৌশল নিয়েছিল, যাকে ‘হাজার কাটা ক্ষত’ বলা হয়। এর অর্থ ছিল সরাসরি বড় যুদ্ধে না গিয়ে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মাধ্যমে ভারতের ভেতরে বারবার হামলা ও অস্থিরতা তৈরি করা। লক্ষ্য ছিল দীর্ঘদিন ধরে ভারতকে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে রাখা।

আফগানিস্তানকে ঘিরে পাকিস্তানের আরেকটি ধারণা ছিল ‘কৌশলগত গভীরতা’। সহজ কথায়, ভারত যদি কখনো পাকিস্তানের সঙ্গে বড় ধরনের যুদ্ধে জড়ায়, তাহলে আফগানিস্তানে একটি পাকিস্তানবান্ধব সরকার থাকলে পাকিস্তান তার পশ্চিম সীমান্ত নিয়ে তুলনামূলকভাবে নিশ্চিন্ত থাকতে পারবে। এই চিন্তা থেকেই তালেবানকে পাকিস্তানের জন্য একটি বন্ধুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে দেখা হয়েছিল। অর্থাৎ, পূর্ব দিকে ভারতের চাপ থাকলেও পশ্চিম দিকে যেন পাকিস্তানকে আরেকটি প্রতিকূল শক্তির মোকাবিলা করতে না হয়, সেটিই ছিল ‘কৌশলগত গভীরতা’র মূল ধারণা।

কিন্তু এই নীতির বড় সমস্যা ছিল, যে শক্তিকে অন্য দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়, তাকে সবসময় নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় না। সময়ের সঙ্গে সেই শক্তিই নিজের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। পাকিস্তানের বর্তমান অভিজ্ঞতা তারই একটি কঠিন উদাহরণ।

পাকিস্তানের এই অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, প্রক্সি শক্তিকে দীর্ঘদিন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। যে গোষ্ঠীকে একসময় কৌশলগত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করা হয়, পরিস্থিতি বদলে গেলে সেই গোষ্ঠীই নিয়ন্ত্রকের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

২০২৫ ও ২০২৬ সালে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। যে তালেবান আন্দোলনকে একসময় পাকিস্তান লালন করেছিল, ২০২১ সালে কাবুলে তাদের প্রত্যাবর্তনের পর থেকে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি পাকিস্তানের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। ইসলামাবাদের অভিযোগ, আফগান ভূখণ্ডে টিটিপি নিরাপদ আশ্রয় পাচ্ছে এবং সেখান থেকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে হামলা চালাচ্ছে। সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ACLED-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল ছিল টিটিপি-সম্পর্কিত সহিংসতার দিক থেকে গত এক দশকের অন্যতম রক্তক্ষয়ী বছর। ওই সময়ে এক হাজারের বেশি সহিংস ঘটনার রেকর্ড পাওয়া গেছে।

উত্তেজনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। পাকিস্তান কাবুল ও কান্দাহারে বিমান হামলা চালানোর পর আফগান বাহিনী পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ‘উন্মুক্ত যুদ্ধ’ ঘোষণা করেন। কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় একাধিকবার যুদ্ধবিরতির চেষ্টা হলেও তা স্থায়ী হয়নি। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের হিসাবে, এই সংঘাতে আফগানিস্তানেই শতাধিক বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। যে শক্তিকে একসময় কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল, সময়ের ব্যবধানে তারই একটি অংশ রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটাই প্রক্সি রাজনীতির সবচেয়ে বড় বিপদ।

পাকিস্তানের সমস্যা আফগান সীমান্তেই থেমে নেই। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বেলুচিস্তানে দীর্ঘদিনের জাতীয়তাবাদী বিদ্রোহ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

স্বাধীন সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বেলুচিস্তানে সহিংস ঘটনা আগের বছরের তুলনায় প্রায় এক-চতুর্থাংশ বেড়েছে এবং ২০২৬ সালেও সেই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর বা সিপিইসির সঙ্গে যুক্ত অবকাঠামো এবং চীনা নাগরিকেরাও বারবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়। কোনো বড় শক্তির সঙ্গে গভীর কৌশলগত ও অবকাঠামোগত সম্পৃক্ততা থাকলেই স্থানীয় জনগোষ্ঠী সেটিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কোনো সম্পৃক্ততাকে যদি স্থানীয় জনগোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থের পরিপন্থী মনে করে, তাহলে সেটি স্থানীয় প্রতিরোধ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

পাকিস্তানের অস্থিরতার আরেকটি দিক রয়েছে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে সামরিক ও বেসামরিক ক্ষমতার টানাপোড়েন, ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন, অর্থনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ওপর নির্ভরতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এসবের ফলে দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একটি রাষ্ট্র যখন নিজের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতেই সমস্যায় পড়ে, তখন তার সঙ্গে গভীর প্রতিরক্ষা বা কৌশলগত চুক্তিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে অন্য দেশের জন্যও বাড়তি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

এই বাস্তবতার মধ্যেই গত দুই বছরে ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্কে লক্ষণীয় উষ্ণতা দেখা গেছে। ২০২৪ সালের গণআন্দোলন-পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রায় দেড় দশকের বিরতির পর দুই দেশের (ঢাকা-ইসলামাবাদ) পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের আলোচনা পুনরায় শুরু হয়েছে। দুই দেশের সেনাপ্রধান পর্যায়ের সফর বিনিময় হয়েছে। পাকিস্তানের গোয়েন্দা প্রধানও ঢাকা সফর করেছেন, যা ১৯৭১ সালের পর এ ধরনের প্রথম সফর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সরাসরি বাণিজ্য, ভিসা সহজীকরণ এবং যৌথ নৌ-মহড়ার মতো উদ্যোগও সামনে এসেছে। এসব অগ্রগতি বাণিজ্য, যোগাযোগ ও জনগণের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

তবে সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে কিছু পুরনো প্রশ্নও থেকে যায়। ১৯৭১ সালের গণহত্যা নিয়ে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা এবং তৎকালীন সম্পদ বণ্টনের অমীমাংসিত বিষয়গুলো এখনো স্পষ্ট সমাধান পায়নি। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা যত গভীর হবে, ভারতসহ প্রতিবেশী শক্তিগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার চ্যালেঞ্জও তত জটিল হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ায় একটি দেশের নিরাপত্তা সিদ্ধান্ত খুব সহজেই অন্য দেশের নিরাপত্তা হিসাবের অংশ হয়ে যায়।

এখানেই বাংলাদেশের জন্য পাকিস্তানের অভিজ্ঞতার মূল শিক্ষা। বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো এবং গভীর সামরিক-কৌশলগত সম্পৃক্ততায় যাওয়া এক বিষয় নয়। অর্থনৈতিক কূটনীতির সুফল পেতে নিরাপত্তা ক্ষেত্রে দ্রুত ও গভীর প্রতিশ্রুতিতে যাওয়ার বহু ধরনের বিপদ যে রয়েছে, তাতে কি সন্দেহের কোনো অবকাশ আছে? সুতরাং কোনো দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা বা গোয়েন্দা সহযোগিতার আগে অংশীদার রাষ্ট্রটির অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, প্রতিবেশীদের সঙ্গে তার চলমান সংঘাত এবং সেই সংঘাতে বাংলাদেশ পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা গভীরভাবে মূল্যায়ন করা দরকার।

ইতিহাসের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোকেও কূটনৈতিক উষ্ণতার আড়ালে চাপা দেওয়া উচিত নয়। ১৯৭১ সালের বিষয়ে ন্যায়বিচারের দাবি এবং ঐতিহাসিক দায়ের প্রশ্নগুলো একটি স্বচ্ছ ও ন্যায্য সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবেই বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন। ইতিহাসকে অস্বীকার করে স্থায়ী সম্পর্ক তৈরি করা যায় না।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় তাকে পাকিস্তানের প্রক্সিনির্ভর নিরাপত্তানীতি এবং তার পরিণতির কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে। কোথায় কার সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে হবে এবং কোথায় সতর্কতার সীমারেখা টানতে হবে—সেই সিদ্ধান্ত বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ধীর, হিসাবি ও বাস্তবভিত্তিক কূটনীতিই দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সবচেয়ে ভালোভাবে সুরক্ষিত রাখতে পারে। স্মর্তব্য যে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে তাকে পাকিস্তানের প্রক্সিনির্ভর নিরাপত্তানীতি এবং তার পরিণতির কথা অবশ্যই স্পষ্টভাবে অনুধাবন করতে হবে। নচেৎ বিপদের শেষ থাকবে না।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪