আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি :
অপারেশন সিঁদুরের সবচেয়ে বড় সাফল্য নিশ্চিত হল বৃহস্পতিবার (৮ মে), যখন সরকারি শীর্ষ গোয়েন্দা সূত্রে জানানো হয়েছে যে পাক পাঞ্জাবের বাহাওয়ালপুরে জইশ-ই-মহম্মদের ঘাঁটিতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অভিযানের সময় খতম হয়েছে জঙ্গি নেতা আব্দুর রউফ আজহার।
রউফ হল জইশ প্রধান মাসুদ আজহারের ছোট ভাই, এবং ১৯৯৯ সালের কান্দাহার বিমান ছিনতাইয়ের প্রধান মাস্টারমাইন্ড হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। এই অভিযানে তার মৃত্যুকে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর এক ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে রউফ আজহার ছিল ভারতের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকার শীর্ষে।
কান্দাহার বিমান ছিনতাইয়ের সময় রউফের বয়স ছিল মাত্র ২৪। সেই সময় থেকেই সে সক্রিয়ভাবে ভারতবিরোধী জঙ্গি কার্যকলাপে যুক্ত ছিল। ছিনতাইয়ের মাধ্যমে মাসুদ আজহারকে মুক্ত করার পরিকল্পনা রউফের করা। সেই অপারেশনের ফলে তৎকালীন বাজপেয়ী সরকার জঙ্গিদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়—রউফ জইশের অপারেশন হেড হিসেবে ২০০১ সালের সংসদ হামলা, ২০০৩ সালের নাগরোটা সেনা ঘাঁটি, ২০১৬ সালের পাঠানকোট এয়ার বেস এবং ২০১৯ সালের পুলওয়ামা হামলার নেপথ্য পরিকল্পকও ছিল। এসব হামলায় অসংখ্য ভারতীয় নাগরিক ও সেনা নিহত হন। তার প্রতিটি কার্যকলাপ ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলির নজরে ছিল, কিন্তু এতদিন সে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে আইএসআই-এর মদতে নিরাপদেই ছিল বলে জানা যায়।
মাসুদ আজহারের অসুস্থতার পর থেকেই জইশের পুরো অপারেশনাল নেতৃত্ব নিজের হাতে তুলে নেয় রউফ। পাকিস্তানে সংগঠন নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পর সে আফগানিস্তানে গিয়ে তালিবান ও অন্যান্য ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে জইশকে নতুন করে শক্তিশালী করার কাজ শুরু করে। বাহাওয়ালপুরে জইশের মূল প্রশিক্ষণ ঘাঁটিটি তারই তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হত। অপারেশন সিঁদুরে সেই ঘাঁটিতে বিমান হামলার সময়ই তার মৃত্যু ঘটে।
এই সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর জঙ্গি দমন অভিযানের একটি যুগান্তকারী অধ্যায় সূচিত হল। সূত্রমতে, বহু বছর ধরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দ্বিপাক্ষিক পর্যায়ে রউফ আজহারের অবস্থান ও তৎপরতা নিয়ে তথ্য বিনিময় চলছিল, তবে তাকে খতম করার সুযোগ এবারই প্রথম তৈরি হয়। গোয়েন্দা সংস্থাগুলি মনে করছে, রউফের মৃত্যুর ফলে জইশ-এর অভ্যন্তরীণ সংগঠন এবং নেতৃত্বের কাঠামোয় বড় ধাক্কা লাগবে, এবং তা পাকিস্তানঘাঁটিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলির মনোবলেও আঘাত হানবে।
এই ঘটনাকে ঘিরে ইসলামাবাদে অস্বস্তি বাড়ছে, কারণ রউফ আজহারের মৃত্যু শুধু এক জঙ্গি নেতার অবসান নয়, বরং পাকিস্তানের মদতপুষ্ট জঙ্গি কাঠামোর এক গভীর ফাটলের ইঙ্গিতও বহন করছে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না এলেও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা একে এক ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’ বা নেতৃত্ব নিধন অভিযানের সার্থক নিদর্শন বলেই বিবেচনা করছেন। এই অভিযানে প্রমাণ হল যে, ভারত এখন কেবল প্রতিরক্ষামূলক নীতি নয়, বরং আক্রমণাত্মক কৌশলে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে।
রউফ আজহারের মৃত্যুর পর দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে এটা নিশ্চিত, ভারতের জঙ্গি দমন অভিযানের ইতিহাসে অপারেশন সিঁদুর এক নতুন মাত্রা এনে দিল, এবং জইশ-এর মেরুদণ্ডে চির ধরিয়ে দিল।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব