আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি :
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের জুলাই মাসের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৭ই মে থেকে ১৫ই জুনের মধ্যে ১,৫০০-এরও বেশি মুসলিম পুরুষ, মহিলা ও শিশুকে কোনো সঠিক আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই বাংলাদেশ সীমান্তে জোর করে ঠেলে পাঠানো হয়েছে। এই অভিযানটি জম্মু ও কাশ্মীরে এক সন্ত্রাসী হামলার পর শুরু হয়, যার জন্য ভারত পাকিস্তানকে দায়ী করেছিল। এরপর থেকে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) শাসিত রাজ্যগুলিতে বাংলাভাষী মুসলিমদের “সন্দেহভাজন অবৈধ অভিবাসী” এবং “সম্ভাব্য নিরাপত্তার ঝুঁকি” হিসেবে চিহ্নিত করে ধরপাকড় শুরু হয়।
এই ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন খাইরুল ইসলাম নামের ৫৩ বছর বয়সী একজন ভারতীয় নাগরিক, যিনি আসামের একজন প্রাক্তন স্কুলশিক্ষক। তিনি জানান, ২৪শে মে পুলিশ তাকে বাড়ি থেকে আটক করে এবং আরও ১৪ জনের সাথে জোর করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। তিনি বলেন, “এটি ছিল একটি ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। আমাকে ভারত ও বাংলাদেশের মাঝখানে একটি নো-ম্যানস-ল্যান্ডে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। যখন আমি ভারতে প্রবেশের চেষ্টা করি, ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা রাবার বুলেট ছোড়া শুরু করে।” পরে তার স্ত্রী ও আত্মীয়রা তার নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র দেখানোর পর তিনি এক সপ্তাহ পর ভারতে ফিরতে সক্ষম হন।
খাইরুল ইসলাম এই ঘটনাকে “সাধারণ হয়রানি” হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, “একজন বাংলাভাষী মুসলিম হওয়া আজ আসামে অপরাধে পরিণত হয়েছে। আমাদের জীবন নরকে পরিণত হয়েছে।... তারা আমাকে কেবল একজন মুসলিম এবং বাংলাভাষী হওয়ার কারণে বিদেশি বলছে।”
ভারতের অসম, পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরা রাজ্যে প্রায় ১০ কোটি বাংলাভাষী মানুষ বাস করে, যাদের মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মুসলিম সম্প্রদায়ের। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এই ধরপাকড়ের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ থেকে “মুসলিম অনুপ্রবেশ” ভারতের পরিচয়ের জন্য হুমকি। তিনি ২৯শে জুলাই এক্স -এ (পূর্বে টুইটার) লেখেন যে, “আমরা সীমান্ত পেরিয়ে মুসলিম অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে নির্ভয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলছি, যা ইতোমধ্যে জনসংখ্যার একটি বিপজ্জনক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। বেশ কিছু জেলায় হিন্দুরা তাদের নিজেদের জমিতে সংখ্যালঘু হওয়ার দ্বারপ্রান্তে।”
তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ডেপুটি এশিয়া ডিরেক্টর মীনাক্ষী গাঙ্গুলী এই পদ্ধতির সমালোচনা করে বলেন, “সরকার অবৈধ অভিবাসন মোকাবিলা করতে পারে, তবে তা অবশ্যই যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে করতে হবে, যেখানে বিভিন্ন বিজেপি শাসিত রাজ্যে নির্বিচারে বাংলাভাষী মুসলিম শ্রমিকদের আটক করে তাদের বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে ধরে নেওয়া হবে না।”এই ধরপাকড় ছাড়াও, আসামে হাজার হাজার পরিবারকে সরকারি জমি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে।
শাজি আলি নামের এক ব্যক্তি, যিনি গোলাঘাট জেলায় উচ্ছেদের শিকার হয়েছেন, তিনি বলেন, “আমি এখানে জন্মেছি। আমার বাবা ৪০ বছরেরও বেশি আগে (বাংলাদেশ থেকে) এখানে এসেছিলেন। এটি আগের সরকারই আমাদের এখানে থাকতে দিয়েছিল। আমাদের এখানে সব সরকারি সুযোগ-সুবিধা আছে। তাহলে আমরা কীভাবে দখলদার হলাম? বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের বাংলাভাষী মুসলিম পরিচয়ই সমস্যা।”অল আসাম মাইনরিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সেক্রেটারি মিনাতুল ইসলাম মনে করেন, এই ধরপাকড়ের পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে।
তিনি বলেন, “আজ আসামে একটি অমানবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বাংলাভাষী মুসলিমরা চরম ভয়ে বাস করছে... এটি একটি রাজনৈতিক কৌশল এবং আসাম সরকার ২০২৬ সালের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই উচ্ছেদ তারই একটি অংশ।” তিনি আরও বলেন, “এর লক্ষ্য হল বাংলাভাষী মুসলিমরা। এটা পরিষ্কার যে আসামে কোনো বাংলাদেশি নেই। সরকার যা করছে তা কোনোভাবেই স্বাস্থ্যকর নয়, এটি কেবল রাজনৈতিক স্বার্থ পূরণের জন্য মুসলিমদের টার্গেট করা।”
রিপোর্টার্স২৪/এসএন