আশিস গুপ্ত, কাঠমান্ডু:
তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংলাপ ‘সাগরমাথা সংবাদ’ শনিবার নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে ২৫ দফার একটি ঘোষণাপত্র গ্রহণের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়েছে। ‘সাগরমাথা কল ফর অ্যাকশন’ নামে পরিচিত এই ঘোষণায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবপ্রাপ্ত হিমালয় অঞ্চলের জন্য একটি বিশেষ জলবায়ু তহবিল গঠনের জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে। এটি বিশ্বের পাহাড়ি ও হিমালয়-পার্বত্য দেশগুলোর পক্ষে প্রথম একটি সমন্বিত উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক ঘোষণা, যা বৈশ্বিক জলবায়ু ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রেও নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ঘোষণায় হিমালয়ের জন্য পৃথক জলবায়ু কেন্দ্র গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যা এই অঞ্চলের জন্য তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, গবেষণা, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং স্থানীয় জনগণের অভিযোজন কৌশল তৈরিতে সহায়ক হবে।
বক্তারা বলেন, হিমালয় অঞ্চল বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের মাত্র ৩% কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী হলেও এর ফলে ক্ষতির পরিমাণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ। সংলাপে অংশগ্রহণকারী দেশ ও সংগঠনগুলো হিমালয় অঞ্চলের জলবায়ু ঝুঁকির তুলনায় বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়নের অনুপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
এতে বলা হয়, এই অঞ্চলটি প্রতিবছর গড়ে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার জলবায়ু অভিযোজন তহবিল প্রয়োজন হলেও বাস্তবে এর একটি ক্ষুদ্রাংশই এখন পর্যন্ত বরাদ্দ হয়েছে। ঘোষণায় জলবায়ু অর্থায়নের ব্যবস্থাপনার জটিলতা দূর করে অনুদান ও স্বল্পসুদে ঋণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
এতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়, বিশ্বব্যাংক ও গ্লোবাল ক্লাইমেট ফান্ডের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে হিমালয়-পার্বত্য অঞ্চলকে পৃথক ক্যাটাগরিতে বিবেচনা করতে ঘোষণায় জাতীয় জলবায়ু পরিকল্পনাগুলোকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতা সীমার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে এবং তা বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে নারী, যুবা, আদিবাসী, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণদের প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণের কথা তুলে ধরা হয়েছে। এতে পরিবেশগত সেবার জন্য অর্থপ্রদানের ব্যবস্থাও উন্নয়নের আহ্বান জানানো হয়েছে।
বন্যা, খরা, ভূমিধস, হিমবাহ গলে যাওয়া এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো ঝুঁকিগুলোর মোকাবেলায় দুর্যোগ পূর্ব সতর্কীকরণ ব্যবস্থাকে উন্নত করতে ঘোষণায় জোর দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, একটি আঞ্চলিক হিমালয় দুর্যোগ ডেটা হাব গঠন করে তথ্য আদানপ্রদান, উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ এবং স্থানীয় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে সার্বিক প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে ।
‘সাগরমাথা কল ফর অ্যাকশন’-এ জলবায়ু অভিযোজন ও টেকসই অবকাঠামো উন্নয়নে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে বৈশ্বিক কর্পোরেট ও বহুপাক্ষিক ব্যাংকগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে প্রযুক্তি স্থানান্তর, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, এবং গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমন হ্রাসে আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থাও শক্তিশালী করার প্রস্তাব এসেছে ।
সাগরমাথা সংবাদ বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনায় হিমালয় অঞ্চলের অবস্থান জোরদার করতে একটি আন্তর্জাতিক বহুপক্ষীয় ফোরাম গঠনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। এটি নীতিনির্ধারকদের পাশাপাশি গবেষক, নাগরিক সমাজ, যুব সংগঠন এবং হিমালয়-পার্বত্য অঞ্চলের প্রতিনিধিদের একত্রিত করে একটি জ্ঞানকেন্দ্র গড়ে তুলবে।
এই সংলাপে নেপালের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী পুষ্পকমল দাহাল 'প্রচণ্ড', জাতিসংঘ, ইউএনডিপি, আইসিমোড, সাসপেন, বিভিন্ন হিমালয় অধ্যুষিত দেশের প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের নেতারা অংশ নেন।
আলোচনার মূল প্রতিপাদ্য ছিল—“পর্বত থেকে মহাসাগর পর্যন্ত: একটিই জলবায়ু, একটি ভবিষ্যৎ।” সাগরমাথা সংবাদ কেবল একটি আঞ্চলিক বৈঠক নয়, বরং এটি হিমালয় অঞ্চলের জনগণের অধিকার, পরিবেশগত সুরক্ষা ও বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের এক ঐতিহাসিক ঘোষণা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব