| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

পশুর হাট ‘টার্গেট’ করে সক্রিয় জাল টাকার চক্র

reporter
  • আপডেট টাইম: মে ১৮, ২০২৬ ইং | ১৯:০৫:৩৪:অপরাহ্ন  |  ৫৪৬ বার পঠিত
পশুর হাট ‘টার্গেট’ করে সক্রিয় জাল টাকার চক্র

স্টাফ রিপোর্টার: পবিত্র ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসতেই আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে জাল টাকার সংঘবদ্ধ চক্র। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বিপুল পরিমাণ জাল নোট।

বিশেষ করে কোরবানির পশুর হাট, শপিংমল, বাস টার্মিনাল ও ঈদকেন্দ্রিক নগদ লেনদেনকে টার্গেট করছে চক্রটি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে প্রায়ই গ্রেপ্তার হচ্ছে জাল টাকার কারবারিরা। তবুও থামছে না জাল নোটের বিস্তার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদকে ঘিরে নগদ লেনদেন বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের অসতর্কতার সুযোগ নিচ্ছে প্রতারক চক্র। ভিড় ও দ্রুত লেনদেনের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই আসল-নকল যাচাই করা সম্ভব হয় না।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বর্তমানে অত্যন্ত কম খরচে উন্নতমানের জাল নোট তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। আগে যেখানে ৫০০ বা ১০০০ টাকার ১০০টি নোট তৈরি করতে খরচ হতো ৪ থেকে ৭ হাজার টাকা, এখন তা নেমে এসেছে প্রায় আড়াই হাজার টাকায়। বর্তমানে এক লাখ টাকার জাল নোট বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, জাল টাকার চক্র এখন অনলাইনভিত্তিক ডেলিভারি ব্যবস্থাও ব্যবহার করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে জাল নোট বিক্রির প্রবণতা বেড়েছে। বিশেষ করে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বেশি তৈরি করা হচ্ছে, কারণ এসব নোট সহজে বাজারে চালানো যায়।

গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গোপনে চালু রয়েছে জাল নোট তৈরির কারখানা। সাধারণ প্রিন্টার, বিশেষ কাগজ, জলছাপ ও গাম ব্যবহার করে এমন সূক্ষ্মভাবে নোট তৈরি করা হচ্ছে, যা অনেক সময় সাধারণ মানুষের পক্ষে শনাক্ত করা কঠিন। কিছু ক্ষেত্রে জাল নোট শনাক্তকারী সাধারণ মেশিনেও তা ধরা পড়ছে না।

টার্গেটে পশুর হাট

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র বলছে, এবার জাল নোট চক্রের সবচেয়ে বড় টার্গেট কোরবানির পশুর হাট। কারণ সেখানে রাতভর নগদ লেনদেন হয়, থাকে অতিরিক্ত ভিড়, আর দ্রুত টাকা গুনে লেনদেন শেষ করতে গিয়ে অনেকেই যাচাইয়ের সুযোগ পান না।

সূত্র জানায়, চক্রের সদস্যরা ক্রেতা সেজে হাটে প্রবেশ করে মোটা অঙ্কের জাল নোট ধরিয়ে দিয়ে দ্রুত সরে পড়ে। কেউ কেউ ছোটখাটো কেনাকাটার মাধ্যমে আসল টাকাও ভাঙিয়ে নেয়। বিশেষ করে রাতের শেষ ভাগে, যখন বিক্রেতারা দ্রুত লেনদেন শেষ করতে চান, তখনই বেশি সক্রিয় থাকে এসব প্রতারক।

উত্তরা-টঙ্গীতে অভিযান, ৩৪ লাখ টাকার জাল নোট জব্দ

সম্প্রতি জাল নোট ছাপানোর তথ্য পেয়ে রাজধানীর উত্তরা ও গাজীপুরে অভিযান চালায় গোয়েন্দা পুলিশ। এ সময় চক্রের তিন সদস্যকে আটক করা হয়।

১৪ মে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, প্রথমে উত্তরায় অভিযান চালিয়ে চক্রের সদস্য মুজিবুর রহমানকে আটক করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যে গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৩৪ লাখ টাকার সমপরিমাণ জাল নোট ও বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এ সময় চক্রের আরও দুই সদস্য দুলাল ও মামুনকে আটক করা হয়।

তিনি বলেন, চক্রটি কোরবানির ঈদ সামনে রেখে ৩৪ লাখ টাকার বেশি জাল নোট ছাপিয়েছে। এসব নোট ঢাকার বিভিন্ন পশুর হাটে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় গোপন ছাপাখানা

গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন আবাসিক ভবন, গ্যারেজ ও বাসা ব্যবহার করা হচ্ছে অস্থায়ী ছাপাখানা হিসেবে।

সূত্র বলছে, চক্রগুলো এখন আর সাধারণ স্ক্যানার বা ফটোকপি নির্ভর নয়। উন্নতমানের প্রিন্টার, স্ক্যানার, কাটিং ডিভাইস ও বিশেষ প্রিন্টিং যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে জাল নোট তৈরি করা হচ্ছে। কিছু যন্ত্রাংশ ভারত, চীন ও দুবাই থেকে সীমান্তপথে আনার তথ্যও পেয়েছেন গোয়েন্দারা।

জাল নোট তৈরিতে ব্যবহৃত বিশেষ কাগজ, নিরাপত্তা সুতাসদৃশ উপকরণ, হলোগ্রাম, রং পরিবর্তনকারী কালি ও ইউভি কেমিক্যাল অনলাইন মার্কেট ও পাইকারি উৎস থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে। আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করে আসল নোট স্ক্যান ও ডিজাইন সম্পাদনা করছে চক্রের সদস্যরা।

গোয়েন্দাদের দাবি, কয়েক স্তরে ভাগ হয়ে পরিচালিত হচ্ছে পুরো নেটওয়ার্ক। একদল ডিজাইন ও প্রিন্টিং করে, আরেক দল পরিবহন এবং অন্য দল বাজারজাতকরণে কাজ করছে। আন্তঃজেলা কুরিয়ার, বাস সার্ভিস ও পণ্যবাহী যান ব্যবহার করে বিভিন্ন জেলায় জাল টাকা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

হাটে থাকবে জাল নোট শনাক্তকরণ বুথ

কোরবানির পশুর হাটে জাল নোট প্রতিরোধে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, সারা দেশের অনুমোদিত পশুর হাটে স্থাপন করতে হবে ‘জাল নোট শনাক্তকরণ বুথ’। সেখানে ব্যাংকের অভিজ্ঞ ক্যাশ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বিনামূল্যে নোট যাচাই ও গণনা সেবা দেওয়া হবে।

গত ১০ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে। এতে বলা হয়, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অনুমোদিত পশুর হাটগুলোয় ঈদের আগের রাত পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে নোট যাচাই সেবা চালু রাখতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, রাজধানীর বিভিন্ন পশুর হাটের জন্য নির্দিষ্ট ব্যাংক দায়িত্ব পালন করবে। গাবতলী পশুর হাটে দায়িত্বে থাকবে ইসলামী ব্যাংক ও সীমান্ত ব্যাংক। এছাড়া সারুলিয়া বাজারে দায়িত্ব পালন করবে প্রিমিয়ার ব্যাংক ও উত্তরা ব্যাংক। ঢাকার বাইরে যেসব জেলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিস নেই, সেখানে সোনালী ব্যাংকের চেস্ট শাখাগুলো সমন্বয়ের মাধ্যমে এ কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

কঠোর নজরদারির দাবি বিশেষজ্ঞদের

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ-অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, জাল টাকা তৈরির সরঞ্জামের সহজলভ্যতা, এজেন্ট নেটওয়ার্কের বিস্তার এবং জামিনে থাকা কারবারিদের পর্যবেক্ষণের অভাবে এ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে।

তিনি বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ হাতিয়ে নিতে সক্রিয় এসব চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও নোট গ্রহণের সময় আরও সতর্ক হতে হবে।

রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪