স্টাফ রিপোর্টার: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে বিএনপি, এনসিপিসহ ২৩টি দল ব্যয়ের হিসাব দেয়নি। তাই আগামী ১৩ জুন পর্যন্ত সময় দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে এই সময়ের মধ্যেও তারা কোনো সাড়া না দিলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে সংস্থাটি।
জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমান মাছউদ বলেন, বিএনপি, এনসিপিসহ যে কয়টি দল নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচনে ব্যয়ের হিসাব জমা দেয়নি, তাদের জন্য এক মাস সময় বাড়ানো হয়েছে। এরপরও তাদের মধ্যে কেউ জমা না দিলে আইনানুগভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কী ব্যবস্থা নেবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে তো বলাই আছে নির্বাচনের ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে দলগুলোকে ব্যয়ের হিসাব দিতে হবে। এর মধ্যে কেউ হিসাব না দিলে এক মাস সময় দিতে পারবে ইসি। সে অনুযায়ী সময় বাড়ানো হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে হিসাব না দিলে জরিমানা হবে। এক্ষেত্রে ১০ হাজার টাকা জরিমানা দিলে সংশ্লিষ্ট দলকে আরও ১৫ দিন সময় দেওয়া যাবে। তারপরও যদি না দেয়, তাহলে নিবন্ধন বাতিলের কথা বলা হয়েছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি, এনসিপিসহ মোট ৫০টি দল অংশগ্রহণ করে। আইন অনুযায়ী, গত ১৩ মে ছিল হিসাব জমা দেওয়ার শেষ সময়। এক্ষেত্রে জামায়াত, জাতীয় পার্টিসহ ২৭ দল হিসাব দেয়। বিএনপি, এনসিপিসহ ২৩ দল দেয়নি।
আইন কী বলছে
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) নির্বাচনী ব্যয় নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে আরপিওতে বলা হয়েছে, কোনো দলের যেসব নির্বাচনী এলাকায় তার প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, সেসব এলাকায় নির্বাচন সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত সময়ের জন্য সব আয় ও ব্যয়ের যথাযথ হিসাব রক্ষণ করবে। এই হিসাবে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, কোনো মনোনয়নপ্রত্যাশী বা অন্য কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে দান হিসেবে প্রাপ্ত পাঁচ হাজার টাকার অধিক অর্থ, তাদের নাম-ঠিকানা এবং প্রত্যেকের কাছ থেকে প্রাপ্ত অর্থ ও প্রাপ্তির ধরন সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। রাজনৈতিক দল দান হিসেবে প্রাপ্ত অর্থের বিস্তারিত তালিকা স্বচ্ছতার সঙ্গে দলের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রদর্শন করবে।
কোনো দলের প্রার্থীর সংখ্যা দুই শতের অধিক হলে চার কোটি ৫০ লাখ টাকা; প্রার্থীর সংখ্যা এক শতের অধিক কিন্তু দুই শতের অধিক না হলে তিন কোটি টাকা; প্রার্থীর সংখ্যা ৫০-এর অধিক কিন্তু এক শতের অধিক না হলে এক কোটি ৫০ লাখ টাকা; আর প্রার্থীর সংখ্যা ৫০-এর অধিক না হলে ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রার্থীপ্রতি দল সর্বোচ্চ এক লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় করতে পারবে। এছাড়া নির্বাচনী প্রচারণার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় ভ্রমণের জন্য দলীয় প্রধানের ব্যয় দলের ব্যয়সীমার বাইরে থাকবে। কোনো দল পাঁচ হাজার টাকার বেশি কোনো দান চেক ছাড়া গ্রহণ করতে পারবে না। যদি কোনো রাজনৈতিক দল এই অনুচ্ছেদের কোনো বিধান লঙ্ঘন করে, তাহলে অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে।
আরপিওতে আরও বলা হয়েছে, ভোটে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক রাজনৈতিক দলকে সব নির্বাচনী এলাকার নির্বাচন সমাপ্ত হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে কমিশনের কাছে ব্যয়ের নিরীক্ষা জমা দিতে হবে। এক্ষেত্রে যেসব নির্বাচনী এলাকায় দলের প্রার্থী ছিল, সেসব এলাকার নির্বাচন সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট সব ব্যয় বা অনুমোদিত ব্যয়ের বিস্তারিত বর্ণনা করে একটি ব্যয় বিবরণী দাখিল করতে হবে। এছাড়া ব্যয় বিবরণীতে দলের ঘোষণাপত্র, নীতি, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সাধারণ প্রচারণার জন্য কৃত ব্যয় এবং প্রত্যেক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট ব্যয় বা অনুমোদিত ব্যয় পৃথকভাবে সন্নিবেশ করতে হবে।
তফসিল ঘোষণার তারিখে দলের তহবিলের প্রারম্ভিক স্থিতি, সব নির্বাচনী এলাকার নির্বাচন সমাপ্ত হওয়ার তারিখে তহবিলের সর্বশেষ স্থিতি এবং ওই দুই তারিখের মধ্যবর্তী সময়ে দান হিসেবে বা অন্য কোনোভাবে দল কর্তৃক প্রাপ্ত মোট অর্থের হিসাব প্রদর্শন করে দলের সম্পাদক কর্তৃক প্রত্যয়িত বিবরণীও দাখিল করতে হবে।
কোনো দল নির্বাচন সমাপ্ত হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে ব্যয় বিবরণী দাখিলে ব্যর্থ হলে কমিশন সতর্কীকরণ নোটিশ পাঠিয়ে আরও ৩০ দিন সময় দিতে পারবে। এই সময়ের মধ্যেও বিবরণী দাখিলে ব্যর্থ হলে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করে আরও ১৫ দিন সময় বাড়াতে পারবে কমিশন। এই সময়ের মধ্যেও কোনো দল ভোটের ব্যয়ের হিসাব জমা না দিলে সংশ্লিষ্ট দলের নিবন্ধন বাতিল করতে পারবে ইসি।
আইনে আরও বলা হয়েছে, প্রার্থী ও দলের ব্যয় বিবরণী রিটার্নিং কর্মকর্তা এক বছর পর্যন্ত নির্ধারিত ফি প্রদানের ভিত্তিতে যে কোনো ব্যক্তিকে অনুলিপি দেবেন। নির্বাচন কমিশনও ওয়েবসাইটে ব্যয় বিবরণী প্রকাশ করবে।
৫০ দলের কোন দলের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী কত
নির্বাচনে বিএনপির ২৯০ জন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামির ২২৭ জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৫৭ জন প্রার্থী ছিল। এই দলগুলোর ব্যয়সীমা আইন অনুযায়ী সাড়ে চার কোটি টাকা। এদিকে জাতীয় পার্টির (জাপা) ২০০ জন প্রার্থী হওয়ায় ব্যয়সীমা তিন কোটি টাকা। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৩২ জন প্রার্থী দেওয়ায় ব্যয়সীমা ৭৫ লাখ টাকা এবং গণঅধিকার পরিষদের ৯৪ জন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হওয়ায় ব্যয়সীমা দেড় কোটি টাকা।
অন্য দলগুলোর মধ্যে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ১২ জন, জাতীয় পার্টি-জেপি ১০ জন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ৬৫ জন, গণতন্ত্রী পার্টি ১ জন, জাতীয় পার্টি ১৯২ জন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ৬ জন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) ২৬ জন, জাকের পার্টি ৭ জন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) ৩৯ জন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ৫ জন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ৮ জন, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ ১৩ জন, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) ২৩ জন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ৪ জন, গণফোরাম ১৯ জন, গণফ্রন্ট ৫ জন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (বাংলাদেশ ন্যাপ) ১ জন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি ৩ জন, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ ১৯ জন, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ২ জন, ইসলামী ঐক্যজোট ২ জন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৩৪ জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৫৩ জন, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ২৬ জন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ১ জন, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ৭ জন, খেলাফত মজলিস ২১ জন, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল) ৬ জন, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট (মুক্তিজোট) ২০ জন, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ) ৮ জন, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম) ৮ জন, বাংলাদেশ কংগ্রেস ১৮ জন, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ ৪২ জন, বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (বাংলাদেশ জাসদ) ১১ জন, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি) ১৯ জন, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ৩০ জন, গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি) ৯০ জন, নাগরিক ঐক্য ১১ জন, গণসংহতি আন্দোলন ১৭ জন, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি ২ জন, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি) ৮ জন, বাংলাদেশ লেবার পার্টি ১৫ জন, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি (বিআরপি) ১২ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৩২ জন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) ২৯ জন, জনতার দল ১৯ জন, আমজনতার দল ১৫ জন, বাংলাদেশ সমঅধিকার পার্টি (বিইপি) ১ জন এবং বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ৩ জন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিল। দলগুলোকে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীসংখ্যা অনুযায়ী ব্যয়সীমা মানতে হবে।
জামায়াত-জাপার ব্যয়
ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জামায়াতে ইসলামী ইতোমধ্যে ব্যয়ের হিসাব দিয়েছে। দলটির মোট ব্যয় হয়েছে ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৪৭ হাজার ৯৭২ টাকা। এর মধ্যে ২২৫ জন প্রার্থীকে অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়েছে ৪ কোটি টাকা। এছাড়া নির্বাচনী ইশতেহার ডিজাইন ও ছাপা, সংবাদ সম্মেলন আয়োজন, আপ্যায়ন, নির্বাচনী সামগ্রী পরিবহন, কেন্দ্রীয় নেতাদের সফর এবং আইসিসিতে বিজ্ঞাপন প্রদানের খাতে এই ব্যয় দেখিয়েছে দলটি।
অন্যদিকে জাতীয় পার্টি (জাপা) দেখিয়েছে মাত্র পাঁচ লাখ টাকা। দলটি প্রার্থীদের কোনো অনুদান দেয়নি। নির্বাচনী প্রচারণা বাবদ দলটি খরচ করেছে ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এছাড়া জনসভা বাবদ জাতীয় পার্টি খরচ করেছে ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা। আর স্টাফ খরচ বাবদ দলটি ব্যয় করেছে ৬৫ হাজার টাকা।
১৩ জুন পর্যন্ত সময় পেয়েছে যে ২৩ দল
৯০ দিনের মধ্যে হিসাব দিতে না পারায় ২৩টি দলকে এক মাস সময় দিয়েছে ইসি। এগুলো হলো-বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল), গণতন্ত্রী পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম), বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), গণফোরাম, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি), গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি), নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন, গণফ্রন্ট, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি), বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি (বিআরপি), জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, আমজনতার দল, বাংলাদেশ সমঅধিকার পার্টি (বিইপি) ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি।
আগামী ১৩ জুনের মধ্যে হিসাব জমা না দিলে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক প্রক্রিয়ায় যেতে পারে নির্বাচন কমিশন।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব