| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

জ্ঞান যেখানে নির্বাসিত, মূর্খতা সেখানে ক্ষমতাবান

reporter
  • আপডেট টাইম: মে ৩০, ২০২৬ ইং | ০২:২৬:১০:পূর্বাহ্ন  |  ১৫৬ বার পঠিত
জ্ঞান যেখানে নির্বাসিত, মূর্খতা সেখানে ক্ষমতাবান

তাওহীদাহ্ রহমান নূভ :

​একটি রাষ্ট্র যখন মেধার অপচয় আর মূর্খতার মহোৎসবে মেতে ওঠে, তখন তার পতন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এক অবধারিত পরিণতি। সমকালীন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক এবং বিশেষ করে রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকালে যে মহানিষ্ক্রমণ চোখে পড়ে, তা কোনো বাহ্যিক অর্থনৈতিক মন্দা বা কাঠামোগত দুর্বলতার গল্প নয়; এটি একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক, নৈতিক এবং সর্বগ্রাসী অস্তিত্বের সংকট। এখানে প্রজ্ঞার প্রদীপের চারপাশ আঁধারে নিমজ্জিত রেখে অজ্ঞতার মশালধারীরা রাজপথ আলোড়িত করছে। যেখানে জ্ঞান নিজেকে গুটিয়ে নেয় সংশয়ে, সেখানে ক্ষমতার পুণ্যভূমিতে মূর্খতা বুক ফুলিয়ে দাঁড়ায় অমোঘ আত্মবিশ্বাসে। এই বৈপরীত্যই আজ আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজকে এক অতল গহ্বরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

​মনস্তাত্ত্বিক, সমাজবৈজ্ঞানিক এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার আলো আঁধারিতে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সংকট কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সামাজিক বিচ্যুতি নয়, বরং এটি ক্ষমতার টিকি ধরে রাখার স্বার্থে সুপরিকল্পিতভাবে তৈরি করা একটি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।

​১. অল্পবিদ্যার দেদীপ্যমান অহংকার ও ক্ষমতার অন্ধ মনস্তত্ত্ব

​আমাদের লোকসংস্কৃতির সেই অতি পরিচিত প্রবাদ—“অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী, চাট্টি মারি তড়বড়ী”—আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতার সবচেয়ে নিখুঁত, রূঢ় ও নগ্ন প্রতিচ্ছবি। মানুষের জ্ঞান যখন অগভীর এবং সীমিত হয়, তখন তার মধ্যে এক ধরণের অলীক ও আক্রমণাত্মক আত্মবিশ্বাস ভর করে। সে নিজের সংকীর্ণ গণ্ডিটাকেই মহাবিশ্বের শেষ সীমানা মনে করে। বাংলাদেশের জনপরিসর এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে আজ এই অন্ধ আত্মবিশ্বাসের এক ভয়ঙ্কর জয়জয়কার দেখা যাচ্ছে।

​এদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বড় অংশের মনস্তত্ত্বে এই "সেলফ-অ্যাসিউরেন্স" বা আত্ম-নিশ্চয়তা এক অদ্ভুত ও সংক্রামক মাত্রায় দৃশ্যমান। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা ব্যক্তিরা নিজেদের ভ্রান্ত, অপরিপক্ব ও পক্ষপাতদুষ্ট ধারণাকে এতটাই জোর দিয়ে, এত উচ্চকণ্ঠে প্রচার করে যে, সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হতে বাধ্য হয়। অজ্ঞতার কোনো সংশয় থাকে না, কারণ তার জগৎ অত্যন্ত ছোট। সে যা জানে না, সেটিকে সে অস্তিত্বহীন মনে করে।

​ফলে তার কণ্ঠস্বর হয় চড়া, তার অঙ্গভঙ্গি হয় স্বৈরতান্ত্রিক এবং তার উপস্থিতি হয় দৃশ্যমান। সে মঞ্চ কাঁপিয়ে বক্তৃতা দেয়, টকশোতে টেবিল চাপড়ে চিৎকার করে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার ভুল ও উগ্র বক্তব্য দিয়েই লক্ষ লক্ষ মানুষের হাততালি কুড়ায়। এই চটকদার মূর্খতা আজ এক ধরণের সামাজিক ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে, যেখানে যুক্তিকে মনে করা হয় একঘেয়ে আর চিৎকারকে ভাবা হয় যোগ্যতা।

​বিপরীতে, প্রকৃত প্রাজ্ঞ ব্যক্তিরা জানেন জগতের রহস্য ও জ্ঞানের পরিধি কতটা অসীম। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই বুদ্ধিবৃত্তিক সততা ও পরিমিতিবোধকে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় "দুর্বলতা", "অসংগঠিততা" বা "অযোগ্যতা" হিসেবে ভুল ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, যা মূর্খদের আরও বেশি আশকারা দিচ্ছে।

​২. ইমপোস্টার সিন্ড্রোম: জ্ঞানীদের আত্মসংশয় ও রাজনৈতিক নির্বাসন

​অল্পবিদ্যার এই আগ্রাসী অহংকারের ঠিক বিপরীত পিঠেই অবস্থান করছে ইমপোস্টার সিন্ড্রোম (Imposter Syndrome), যা এদেশের চিন্তাশীল ও সংবেদনশীল সমাজকে পঙ্গু করে রেখেছে। এই মনস্তাত্ত্বিক সংকটের কারণে উচ্চ শিক্ষিত, প্রাজ্ঞ এবং প্রকৃত যোগ্য মানুষেরা সবসময় এক ধরণের তীব্র আত্মসংশয়ে ভোগেন। তারা প্রতিনিয়ত ভাবেন, “আমি কি আসলেই এই বিষয়ে কথা বলার যোগ্য?”, “আমার কি আরও জানা উচিত ছিল না?”

​এই অতিরিক্ত আত্মমূল্যায়ন, নৈতিক দায়বদ্ধতা ও সততার কারণে জ্ঞানীরা জনপরিসরে কথা বলতে ভয় পান, পাছে কোনো ভুল হয়ে যায়! অন্যদিকে, বর্তমান নোংরা ও পেশীশক্তি-সর্বস্ব রাজনৈতিক পরিবেশ তাদের আরও বেশি গুটিয়ে নিতে বাধ্য করে। মেধার এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক ভয়ের পূর্ণ ফায়দা তোলে মূর্খরা। জ্ঞানীরা যখন নিজের যোগ্যতা নিয়ে সংশয়ে ভুগছেন বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ভয়ে নীরব থাকছেন, মূর্খরা তখন তাদের অযোগ্যতাকে ক্ষমতার জোরে পুষ্ট করে রাজত্ব করছে।

​ফলস্বরূপ, যোগ্য মানুষেরা নীতিনির্ধারণী বা রাষ্ট্রীয় আলোচনা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেন, আর সেই খালি জায়গা দখল করে নেয় কোনো এক উচ্চকণ্ঠের চাটুকার। রাজনীতি আজ প্রাজ্ঞদের জন্য এক ধরণের নির্বাসন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে, আর মূর্খদের জন্য উন্মুক্ত করেছে এক অনন্ত সম্ভাবনার দুয়ার।

​৩. লজ্জাহীনতার সিন্ডিকেট: দলীয় অন্ধত্ব ও ফ্যাসিবাদের উত্থান

​যখন লজ্জাহীন ও অজ্ঞ মানুষেরা রাজনৈতিকভাবে সংঘবদ্ধ হয়, তখন সেখানে কাজ করে গ্রুপথিংক (Groupthink) বা দলবদ্ধ চিন্তার অন্ধত্ব। এই মনস্তত্ত্বে দলের ভেতরের কেউ কোনো যৌক্তিক প্রশ্ন তোলে না, বরং সবাই অন্ধভাবে এক উগ্র ও উন্মাদের মতো একই সুরে চিৎকার করতে থাকে। এই সংঘবদ্ধতার প্রধান চালিকাশক্তি হলো নৈতিক লজ্জাহীনতা এবং দলীয় অন্ধত্ব। লজ্জাবোধ মানুষের বিবেকের শেষ প্রাচীর; যখন সেই প্রাচীর ভেঙে পড়ে, তখন মানুষ যেকোনো স্তরের বর্বরতায় লিপ্ত হতে পারে।

​এর সাথে যোগ হয় ক্র্যাব মেন্টালিটি (Crab Mentality) বা কাঁকড়া মানসিকতা। রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের কেউ যদি একটু যৌক্তিকভাবে চিন্তা করতে চায় বা মেধার পরিচয় দিতে যায়, বাকিরা তাকে টেনে নিচে নামিয়ে আনে এবং "দলদ্রোহী" বা "বিশ্বাসঘাতক" তকমা দিয়ে দেয়।

​ইতিহাসে ফ্যাসিবাদের উত্থান লক্ষ্য করলে দেখা যায়—লজ্জাহীন, অজ্ঞ, উগ্র ও অন্ধ আনুগত্যনির্ভর জনগোষ্ঠী এভাবেই সংঘবদ্ধ হয়ে ক্ষমতার অলিন্দ দখল করেছে। তারা দমন, পীড়ন, সহিংসতা ও স্বৈরতন্ত্র কায়েম করে মেধা ও মননের ওপর প্রথম আঘাতটি হানে। মেধার উপাসনালয়গুলো তখন মুখ থুবড়ে পড়ে আর চামচামি ও চাটুকারিতার সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। সংঘবদ্ধ রাজনৈতিক মূর্খরা কোনো সমালোচনা সইতে পারে না; তাই তারা যুক্তির জবাব দেয় লাঠি দিয়ে, আর সত্যের জবাব দেয় কুৎসাপদ ছড়ানোর মাধ্যমে।

​৪. মেধার রাজনৈতিক অবমূল্যায়ন ও ব্রেন ড্রেনের মহাকাব্য

​এই শ্বাসরুদ্ধকর রাজনৈতিক পরিস্থিতির সরাসরি সামাজিক ফল হলো ব্রেন ড্রেন (Brain Drain) বা মেধা পাচার। যখন একটি রাষ্ট্রে মেধার চেয়ে চামচামি, আর যুক্তির চেয়ে দলীয় ট্যাগ ও পেশীশক্তি প্রাধান্য পায়, তখন চিন্তাশীল ও প্রতিভাবান তরুণেরা তীব্র হতাশায় ভোগেন। তারা দেখেন যে, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও চাটুকারিতা আর উগ্র রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের অংশ না হওয়ার কারণে তারা পদে পদে অবমূল্যায়িত, লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত হচ্ছেন।

​ফলাফল যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে; দেশের সবচেয়ে ক্ষুরধার মস্তিষ্কগুলো, সেরা গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী আর চিন্তাবিদেরা নিজেদের সুরক্ষার জন্য এবং একটি মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে বাঁচার তাগিদে দেশ ত্যাগ করছেন। সমাজ হারিয়ে ফেলছে তার ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তিদের, আর পেছনে পড়ে থাকছে এক বিশাল মেধান্ধ ও তোষামোদকারী জনগোষ্ঠী, যারা রাষ্ট্রকে কেবল পেছনের দিকেই টেনে নিয়ে যেতে পারে। মেধার এই নির্গমন দেশকে ক্রমান্বয়ে একটি "মেধাশূন্য" মরুভূমিতে পরিণত করছে, যেখানে শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার দম্ভ ও সস্তা স্লোগানের অনুরণন শোনা যায়।

​৫. হুজুগ ও অপপ্রচারের ডিজিটাল সংস্কৃতি: ‘ইকো চেম্বার’ ও রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা

​ডিজিটাল যুগে রাজনৈতিক মূর্খতার এই জয়যাত্রা আরও সহজ ও চটকদার হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যালগরিদমের কারণে। মনস্তত্ত্বের ভাষায় একে বলা যায় ইকো চেম্বার (Echo Chamber) এফেক্ট। এখানে রাজনৈতিক দলগুলোর আইটি সেল এবং উগ্র সমর্থকেরা যখন কোনো ভুল তথ্য বা সস্তা হুজুগ ছড়ায়, তখন তাদের মতোই হাজারো অন্ধ ভক্ত সেই একই সুরের প্রতিধ্বনি করতে থাকে। এর ফলে একটি অলীক ও political-ভাবে সুবিধাজনক মিথ্যা ধারণাই সত্যের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।

​যখন বিশ্লেষণ, যুক্তি ও সতর্কতার পক্ষে থাকা কণ্ঠগুলো নীরব থাকে, তখন সমাজে মূর্খদের মূর্খামি, ভুল তথ্য, মিথ্যাচার ও চেঁচামেচিনির্ভর বক্তব্য সহজে জায়গা করে নেয়। এই পরিবেশ সাধারণ মানুষের বিচারবুদ্ধিকেও অসাড় করে দেয়। মানুষ তখন গভীর ভাবনার চেয়ে চটকদার রাজনৈতিক মিথ্যা আর উগ্র স্লোগানে বেশি স্বস্তি পায়। ফলে দেশের সামগ্রিক রুচি ও চিন্তার মানদণ্ড দিন দিন নিচে নামতে থাকে, এবং সমাজ পরিণত হয় একটি লাইক-শেয়ার-কমেন্টের বৃত্তে বন্দি হুজুগে কারখানায়।

​৬. জ্ঞানীদের নীরবতা: এক বুদ্ধিবৃত্তিক ও নাগরিক অপরাধ

​আইরিশ দার্শনিক এডমন্ড বার্ক বলেছিলেন—“মন্দের বিজয়ের জন্য কেবল ভালো মানুষদের নিষ্ক্রিয় থাকাই যথেষ্ট।” ​জনপরিসরে চিন্তাশীল মানুষের নীরবতা আজ রাজনৈতিক মূর্খদের সবচেয়ে বড় জ্বালানি। জ্ঞানীরা যখন তাদের সুরক্ষাবলয়ে বসে কেবলই দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে রাষ্ট্রের পতন অবলোকন করেন আর নিজেরা নিষ্ক্রিয় থাকেন, তখন প্রকারান্তরে তারা স্বৈরতন্ত্র ও অজ্ঞতার হাতকেই শক্তিশালী করেন।

​এই নীরবতা কেবল আত্মরক্ষা নয়, এটি এক ধরণের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিশ্বাসঘাতকতা। জ্ঞানীরা যখন ভাবেন "রাজনীতির এই কাদা ঘেঁটে কী লাভ", তখন তারা প্রকারান্তরে সেই কাদা পুরো দেশের গায়ে মাখার সুযোগ করে দেন। যুক্তির কণ্ঠ যখন স্তব্ধ থাকে, তখন কুযুক্তির আস্ফালন অবধারিত। এর ফলে রাষ্ট্রে নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মেরুদণ্ডটি ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে। জ্ঞানীদের এই সচেতন সংযম বা ভীরুতা একসময় রূপ নেয় "অপরাধমূলক নীরবতায়"।

​৭. এই বুদ্ধিবৃত্তিক ও political অন্ধকার থেকে উত্তরণের উপায়

​এই দমবন্ধকর পরিস্থিতি থেকে রাতারাতি মুক্তি অসম্ভব, তবে প্রখর, আপসহীন ও সুনির্দিষ্ট কিছু চটকদার ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপের মাধ্যমে এই সামাজিক ও রাজনৈতিক পচনের গতি রোধ করা সম্ভব।

বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধের দেয়াল (Intellectual Resistance): জ্ঞানীদের নীরবতার সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক ভয়ের দেয়াল সবার আগে ভাঙতে হবে। সমাজ ও রাষ্ট্রকে পরিবর্তনের জন্য চিন্তাশীল মানুষদের জনপরিসরে (Public Sphere) আসতে হবে। সস্তা সরণি ছেড়ে গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং লেখালেখির মাধ্যমে যুক্তির চর্চাকে আকর্ষণীয় ও চটকদার করে তুলতে হবে। ভুল তথ্য ও রাজনৈতিক অপপ্রচারের বিরুদ্ধে তথ্যের "কাউন্টার-অ্যাটাক" বা পাল্টা আক্রমণ জোরদার করতে হবে। জ্ঞানীদের বুঝতে হবে, মাঠ খালি রাখলে সেখানে আগাছাই জন্মাবে।

​মেধাতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা (Meritocracy Over Mediocracy): রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক প্রতিটি স্তরে তোষামোদি ও অন্ধ দলীয় আনুগত্যের বদলে মেধা ও যোগ্যতাকে মূল্যায়নের প্রধান শর্ত বানাতে হবে। নীতি-নির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে শিক্ষাঙ্গন, প্রশাসন—সবখানে যেন 'লুটেরা ও চাটুকার মনস্তত্ত্বের' মূর্খরা জায়গা না পায়, তার জন্য কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক ফিল্টারিং বা ছাঁকন প্রক্রিয়া চালু করতে হবে। অযোগ্যদের উচ্চকণ্ঠকে স্তব্ধ করার একমাত্র উপায় যোগ্য ও সৎ মানুষদের চালকের আসনে বসানো।

​শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার ও ছাত্ররাজনীতির গুণগত পরিবর্তন: মুখস্থনির্ভর এবং সার্টিফিকেট-সর্বস্ব শিক্ষা মূর্খতার চেয়েও বিপজ্জনক "অর্ধশিক্ষিত" দানব তৈরি করে, যারা নিজেদের মহাজ্ঞানী মনে করে এবং লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতিতে জড়ায়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ক্রিটিক্যাল থিংকিং (Critical Thinking) বা বিশ্লেষণাত্মক চিন্তাভাবনা এবং নৈতিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সাথে শিক্ষাঙ্গনে লাঠিয়াল ও টেন্ডারবাজির রাজনীতি বন্ধ করে জ্ঞান, যুক্তি ও কল্যাণের রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রশ্ন করার স্বাধীনতা ও যুক্তির মাধ্যমে সত্য আবিষ্কারের মানসিকতা শৈশব থেকেই গড়ে তুলতে হবে।

​সুস্থ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকল্প তৈরি: যখন সুস্থ রাজনীতি এবং উন্নত সংস্কৃতির চর্চা বন্ধ হয়ে যায়, তখন সেখানে উগ্রতা ও মূর্খতার আগাছা জন্মায়। তরুণ প্রজন্মকে দলীয় অন্ধত্বের বাইরে এসে দেশপ্রেম, বই পড়া, বিতর্ক, থিয়েটার এবং সুস্থ ক্রীড়া সংস্কৃতির দিকে ধাবিত করতে হবে, যাতে তারা সস্তা রাজনৈতিক চেঁচামেচির চেয়ে গভীর চিন্তার প্রতি আকৃষ্ট হয়। মেধার জন্য একটি সহায়ক ও নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজ উভয়েরই দায়িত্ব।

​উপসংহার

​বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আজ এক ঐতিহাসিক ও নাটকীয় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমরা কি একটি হুজুগে, উগ্র ও সংঘবদ্ধ রাজনৈতিক মূর্খতার অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাব, নাকি একটি প্রাজ্ঞ, সংবেদনশীল ও যুক্তিবাদী রাষ্ট্র বিনির্মাণ করব—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই। জ্ঞানীদের মনে রাখতে হবে, তাদের নীরবতা কেবল তাদের নিজেদেরই বিপন্ন করছে না, বরং আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎকেও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

​মূর্খতার এই কর্কশ কোলাহল ও রাজনৈতিক আস্ফালনকে থামাতে হলে প্রজ্ঞার কণ্ঠস্বরকে আরও সুদৃঢ়, স্পষ্ট এবং বজ্রকণ্ঠী হতে হবে। মেধার জয়গান তখনই গীত হবে, যখন বিবেকবান মানুষ নিষ্ক্রিয়তার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে সত্য, যুক্তি ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াবে। অজ্ঞতার অন্ধকারের প্রত্যুত্তর কেবলই প্রজ্ঞার তীব্র ও চোখধাঁধানো আলো।

লেখক: কবি ও সম্পাদক (কবিয়াল)

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪