| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

গোপালগঞ্জে এনসিপির পথসভায় হামলা : গুলিবিদ্ধ ৪ জন নিহত, কারফিউ জারি

reporter
  • আপডেট টাইম: Jul ১৬, ২০২৫ ইং | ০৯:৫৮:৫৮:পূর্বাহ্ন  |  ১৪৯৬৭৬৩ বার পঠিত
গোপালগঞ্জে এনসিপির পথসভায় হামলা : গুলিবিদ্ধ ৪ জন নিহত, কারফিউ জারি

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি : গোপালগঞ্জে সভা শেষে ফেরার পথে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) গাড়িবহরে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের হামলার জেরে হামলাকারী ও পুলিশের মধ্যে প্রায় তিন ঘণ্টা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে। এতে বাজার এলাকা থেকে পাচুড়িয়া পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কে রণক্ষেত্র পরিণত হয়।  পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশও সেনাবাহিনী হামলাকারীদের ওপর গুলি চালায়। এতে নিষিদ্ধ ঘোষিত যুবলীগ সদস্যসহ চারজন নিহত এবং সাংবাদিক-পুলিশসহ প্রায় ১০০ জন আহত হয়েছে।

নিহতরা হলেন- জেলা শহরের উদয়ন রোডের সন্তোষ সাহার ছেলে যুবলীগ সদস্য দীপ্ত সাহা (২৫), শহরের থানাপাড়ার কামরুল কাজীর ছেলে রমজান কাজী (২৪) সদর উপজেলার আড়পাড়া এলাকার আজাদ তালুকদারের ছেলে ইমন তালুকদার (১৮) এবং টুঙ্গিপাড়ার ইদ্রিস মোল্যা। এরা সবাই গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন বলে গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. শেখ মো. নাবিল সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন।

গোপালগঞ্জের ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. জীবিতেষ বিশ্বাস জানিয়েছেন, আরও ১২ জনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। তাঁদের অস্ত্রোপচার চলছে। এখন পর্যন্ত চার জনের মৃতদেহ হাসপাতালে এসেছে। তাদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। মোট চারজনের মৃত্যু হয়েছে।'

গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক মুহম্মদ কামরুজ্জামান বলেছেন, 'গোপালগঞ্জে এনসিপির পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য জেলাজুড়ে অনির্ষ্টিকালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। পরবর্তীতে রাত ৮টা থেকে পরের দিন বৃহস্পতিবার ৬টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করা হয়।'

তিনি বলেন, 'এসব ঘটনায় জেলা শহরসহ আশপাশ এলাকায় ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।'

জেলা প্রশাসক বলেন, বুধবার দুপুর আড়াইটার পরে এনসিপি তাদের কর্মসূচি শেষ করে যাওয়ার সময় শহরের লঞ্চ ঘাট এলাকায় গোপালগঞ্জ সরকারি কলেজের সামনে এই হামলার ঘটনা ঘটে।

তিনি বলেন, এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্থানীয় জনতা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যরা এসময় হামলাকারীদের উদ্দেশ্যে রাবার বুলেট ও টিয়ারসেল ছোঁড়ে। মুহুর্তের মধ্যে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় ওই এলাকা এবং সংঘর্ষ সারা শহর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

তিনি আরও বলেন, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্থানীয় জনতা জেলা কারাগারে হামলা করে। তারা কারাগারের প্রধান ফটক ভাঙার চেষ্টা করে। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের প্রতিহত করে। এ সময় এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আশ্রয় নেয়।

পরে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে এনসিপির নেতাকর্মীদের একত্র করে সেনা পাহাড়ায় বাগেরহাটের প্রবেশদ্বার মোল্লারহাট সেতু পার করে দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান।

এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পূর্বঘোষিত 'মার্চ টু গোপালগঞ্জ' কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগের হামলার ঘটনায়- গোপালগঞ্জে আজ রাত ৮টা থেকে আগামীকাল বিকেল ৬টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করা হয়েছে। আজ বুধবার (১৬ জুলাই) ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে একথা জানিয়েছে্ন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।

সংক্ষিপ্ত ওই স্ট্যাটাসে শফিকুল আলম জানান, "গোপালগঞ্জে আজ রাত ৮টা হতে পরবর্তী দিন বিকাল ৬টা পর্যন্ত কারফিউ জারী করা হয়েছে।"

আজ বুধবার (১৬ জুলাই) বেলা পৌনে তিনটার দিকে শহরের পৌর পার্কে এনসিপির সমাবেশ শেষে তাদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।

হামলার ঘটনার পর এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সাংবাদিকদের বলেন, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা এই হামলা চালিয়েছেন। এ সময় পুলিশ-সেনাবাহিনী নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। তাদের (এনসিপি) বলা হয়েছিল, সবকিছু ঠিক আছে। কিন্তু তাঁরা সমাবেশস্থলে এসে দেখেন পরিস্থিতি ঠিক নেই।

হামলার পর এনসিপির নেতারা গোপালগঞ্জ পুলিশ সুপার কার্যালয়ে অবস্থান নেন।

পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আরিফুর রহমান তুহিন দাবি করেন, "প্রশাসন আমাদের পুরোপুরি নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। খুনি হাসিনার কিছু সন্ত্রাসী বাহিনী আমাদের এখানে আসার পথেই বাধা দিচ্ছিল। প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি। এমন হয়েছে যে প্রশাসনকে আমরা প্রটোকল দিয়ে নিয়ে আসছিলাম। আমরা গোপালগঞ্জবাসীকে সঙ্গে নিয়ে এখানে সমাবেশ করছিলাম। সমাবেশ করার পর বের হওয়ার সময় আওয়ামী লীগের গুন্ডারা মুহুর্মুহু গুলি শুরু করে। পুলিশ লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গেছে। এটা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক।"

এনসিপি নেতারা গোপালগঞ্জে সমাবেশ শেষ করে টেকেরহাট হয়ে মাদারীপুরের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন। পরে হামলার মুখে ছত্রভঙ্গ হয়ে যান তারা। এনসিপি’র মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা যখন রওনা দিয়েছি, তখন গ্রাম থেকে যত আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ, সারা বাংলাদেশ থেকে আওয়ামী লীগের লোকজন এসে আমাদের ওপর হামলা করেছে।’

প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন বলেন, সমাবেশ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে এনসিপির নেতা-কর্মীদের ঘিরে হামলা চালান। এ সময় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা সাউন্ড গ্রেনেড ও ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। এনসিপির নেতা-কর্মীরা অন্যদিক দিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।

এর আগে বেলা পৌনে ২টার দিকে সমাবেশ শুরুর আগে ২০০ থেকে ৩০০ লোক লাঠিসোঁটা নিয়ে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিয়ে এনসিপির সমাবেশস্থলে যান। সে সময় মঞ্চের আশপাশে থাকা পুলিশ সদস্যরা সেখান থেকে দ্রুত আদালত চত্বরে ঢুকে পড়েন। একই সময়ে মঞ্চে ও মঞ্চের সামনে থাকা এনসিপির নেতা-কর্মীরাও দৌড়ে সরে যান। যাঁরা হামলা চালান, তাঁরা সবাই আওয়ামী লীগের সমর্থক বলে এনসিপির নেতা-কর্মীরা অভিযোগ করেছিলেন। ওই সময় হামলাকারীরা মঞ্চের চেয়ার ভাঙচুর করেন, ব্যানার ছিঁড়ে ফেলেন।

একপর্যায়ে জেলা পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান ঘটনাস্থলে যান। এনসিপির নেতা-কর্মী ও পুলিশ এক হয়ে ধাওয়া দিলে হামলাকারীরা পালিয়ে যান। বেলা ২টা ৫ মিনিটে সমাবেশস্থলে পৌঁছান এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্যসচিব আখতার হোসেন, মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ, মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলমসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। সেখানে সমাবেশ করে এনসিপি। সমাবেশ শেষে এনসিপির নেতা-কর্মীদের ঘিরে হামলার ঘটনা ঘটে।

এর আগে এনসিপির কর্মসূচি ঘিরে গোপালগঞ্জে পুলিশের গাড়িতে আগুন ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) গাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গোপালগঞ্জ-টেকেরহাট সড়কের সদর উপজেলার কংশুরে এ ঘটনা ঘটে।

পুলিশের গাড়ি পোড়ানোর একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে দেখা যায়, গাড়ি পোড়ানোর সময় সেখানে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের গোপালগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক মো. পিয়ালকে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। অন্য আরেকজনকে বলতে শোনা যায়, 'আমরা পিয়াল ভাইয়ের সাথে আছি।'

সার্কিট হাউজে আশ্রয় :  সমাবেশ শেষে ফেরার পথে হামলার শিকার হয়েছে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাদের গাড়িবহর। অতর্কিত হামলার পর জেলা সার্কিট হাউজে আশ্রয় নিয়েছেন নাহিদ, হাসনাত, সারজিসসহ এনসিপির নেতারা। বুধবার (১৬ জুলাই) বিকেল ৩টার দিকে তারা গোপালগঞ্জ সার্কিট হাউজে অবস্থান আশ্রয় নেন। দুপুর পৌনে ৩টার দিকে এ শহরের পৌরপার্ক এলাকার অদূরে এ হামলার ঘটনা ঘটে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত হামলাকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলছে। হামলার পর এনসিপি নেতারা গোপালগঞ্জ সার্কিট হাউজে আশ্রয় নেন।

ইউএনও’র ওপর হামলা : এর আগে,  সকাল ৯টার দিকে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার উলপুর এলাকায় পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় এক পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে আহত করার ঘটনাও ভিডিওতে ধরা পড়ে, যেখানে দেখা যায় হামলাকারীরা পুলিশ সদস্যকে ধাওয়া করছে।

গোপালগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মির মো. সাজেদুর রহমান বলেন, “জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ গোপালগঞ্জ শহরের পৌর পার্কে পদযাত্রা আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিত থাকার কথা ছিল। এই কর্মসূচিকে বানচাল করতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে একটি গাড়িতে আগুন দেয় ও ভাঙচুর করে।”

তিনি আরও জানান, হামলার সময় জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান পিয়ালের অনুসারীদের দেখা গেছে। তবে এখন পর্যন্ত হতাহতের কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। এর আগে সকালেই সদর উপজেলার গান্ধিয়াশুর এলাকায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এম রকিবুল হাসানের গাড়ি বহরে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। ইউএনও জানান, “জাতীয় নাগরিক পার্টির পদযাত্রা ঘিরে গান্ধিয়াশুর এলাকায় আমার গাড়িবহর লক্ষ করে হামলা চালানো হয়। এতে কয়েকজন আহত হয়েছেন।”

তিনি আরও বলেন, “পদযাত্রার আগে কেন্দ্রীয় নেতারা গোপালগঞ্জে আসার কথা ছিল। পরিকল্পিতভাবে এই কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করতে এমন হামলা হয়েছে বলে মনে করছি।” এনসিপি সূত্রে জানা গেছে, জুলাই মাসজুড়ে ‘দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা’ শিরোনামে কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে দলটি। মাসব্যাপী এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে গোপালগঞ্জে বুধবার পদযাত্রার আয়োজন করা হয়। মঙ্গলবার (১৫ জুলাই) এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম সামাজিক মাধ্যমে কর্মসূচির ঘোষণা দেন। এরপর দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারাসহ অন্যান্য নেতারাও কর্মসূচি সফল করার আহ্বান জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেন।


রিপোর্টার্স২৪ /এসএন

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪