স্টাফ রিপোর্টার:
দীর্ঘদিনের গোয়েন্দা তৎপরতা ও পরিকল্পনায় শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয় । মঙ্গলবার ভোর ৫টা ১৫ মিনিটে কুষ্টিয়ার সোনার বাংলা রোডের একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে সকাল ৭টার দিকে রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তাররা হলেন- দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ওরফে ফতেহ আলী, আবু রাসেল মাসুদ ওরফে মোল্লা মাসুদ এবং দুজন শুটার আরাফাত ও শরীফ। গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে ৫টি বিদেশি পিস্তল, ১০টি ম্যাগাজিন, ৫৩ রাউন্ড গুলি ও ১টি স্যাটেলাইট ফোন উদ্ধার করা হয়।
এদিকে মঙ্গলবার (২৭ মে) বিকেলে সেনানিবাসে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান আইএসপিআরের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সামি-উদ-দৌলা চৌধুরী।
তিনি বলেন, এই চক্রটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হত্যা, চাঁদাবাজি ও নাশকতা চালিয়ে আসছিল। সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ হলো তালিকাভুক্ত ২৩ জন শীর্ষ সন্ত্রাসী দলের অন্যতম নেতা এবং সেভেন স্টার চক্রের মূল পরিকল্পনাকারী। এই অভিযান ছিল দীর্ঘদিনের গোয়েন্দা তৎপরতা ও পরিকল্পনার ফসল। অপারেশনটি অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ক্ষয়ক্ষতি বা সংঘর্ষ ছাড়াই পরিচালিত হয়, যা আমাদের বাহিনীর পেশাদারিত্ব এবং রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় ও সহায়তা দিয়েছে সেনা সদরের সামরিক অপারেশন পরিদপ্তর, ৫৫ পদাতিক ডিভিশন, ১৪ স্বতন্ত্র ইঞ্জিনিয়ার বিগ্রেড, ৭১ মেকানাইজ বিগ্রেড ও এনএসআই।
তিনি আরও বলেন, এ ছাড়া আমি আপনাদের মাধ্যমে দেশের জনগণকে জানাতে চাই— যেকোনো ধরনের সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড কিংবা সন্ত্রাসবাদ সংক্রান্ত তথ্য অনুগ্রহ করে নিকটস্থ সেনাক্যাম্প অথবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করুন। আমরা আবারও দৃঢ়ভাবে জানাতে চাই— সেনাবাহিনী প্রধানের সুস্পষ্ট নির্দেশনার আলোকে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং জনগণের জানমালের সুরক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ প্রস্তুত ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সবসময় জনগণের পাশে আছে এবং থাকবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা যায়, কুষ্টিয়া সদরের সোনার বাংলা রোডে সকাল সোয়া ৫টার দিকে অভিযান চালিয়ে সুব্রত বাইন ওরফে ফতেহ আলী ও আবু রাসেল মাসুদ ওরফে মোল্লা মাসুদকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্য মতে, রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকায় সকাল ৭টার দিকে অভিযান চালিয়ে শুটার আরাফাত ও গাড়িচালক শরীফকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই দুই শুটার আরাফাত ও গাড়িচালক শরীফ সুব্রত বাইনের সহযোগী।
নব্বইয়ের দশকে ঢাকার অপরাধজগতের আলোচিত নাম ছিল সুব্রত বাইন। আধিপত্য বিস্তার করে দরপত্র নিয়ন্ত্রণ ও বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজিতে তাঁর নাম আসা ছিল তখনকার নিয়মিত ঘটনা। এসব কাজ করতে গিয়ে অসংখ্য খুন-জখমের ঘটনাও ঘটেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, মূলত নব্বইয়ের দশকে মগবাজারের বিশাল সেন্টার ঘিরেই উত্থান হয় সুব্রত বাইনের। তিনি এই বিপণিবিতানের কাছে চাংপাই নামে একটি রেস্টুরেন্টের কর্মচারী ছিলেন। সেখান থেকে ধীরে ধীরে অপরাধজগতের সঙ্গে জড়িয়ে যান। পরে বিশাল সেন্টারই হয়ে ওঠে তাঁর কর্মকাণ্ড পরিচালনার কেন্দ্র। এ জন্য অনেকে তাঁকে ‘বিশালের সুব্রত’ নামেও চেনেন।
২০০১ সালের ২৫ ডিসেম্বর ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর যে নামের তালিকা তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকার ঘোষণা করেছিল, তাঁদের অন্যতম ছিলেন সুব্রত বাইন। তাঁর নামে এখনো ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি রয়েছে। সেখানে তাঁর বয়স দেখানো হয়েছে ৫৫ বছর। তাঁকে ধরিয়ে দিতে তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুরস্কার ঘোষণা করেছিল।
অন্যদিকে মোল্লা মাসুদ ২০১৫ সালে ভারতে ধরা পড়েন বলে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। পরে তিনি জামিনে মুক্ত হন এবং ভারতেই অবস্থান করেছিলেন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সূত্রে জানা গিয়েছিল।
মোল্লা মাসুদ রাজধানীর মতিঝিল ও গোপীবাগ এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করতেন। সুব্রত বাইনের হাত ধরেই মোল্লা মাসুদ অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়েন। ২০০৩ সালের পরে তাঁকে আর বাংলাদেশে দেখা যায়নি। ভারতে তিনি আবু রাসেল মো. মাসুদ নামে পরিচিত হন। ভারতীয় নাগরিক রিজিয়া সুলতানাকে বিয়ে করে সেখানে বসবাস করছিলেন।
পুলিশ সূত্র জানায়, মোল্লা মাসুদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা আছে, তার মধ্যে সাবেক সাংসদ কামাল মজুমদারের ভাগনে মামুন হত্যা, পুরান ঢাকায় মুরগি মিলন হত্যা, খিলগাঁওয়ের তিলপাপাড়ায় ট্রিপল মার্ডার উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অসংখ্য জিডি আছে। ২০০১ সালে তৎকালীন সরকার যে ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম ঘোষণা করে, তাতে মোল্লা মাসুদেরও নাম ছিল।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব