ফয়সাল করিম: রাত তখন প্রায় দুটা। কুষ্টিয়ার ছোট্ট এক ক্লিনিকের করিডোরে বসে আছে পল্লী বিদুৎতের কর্মচারী জামশেদ হোসেন। চোখে ক্লান্তি, মুখে অদ্ভুত এক যন্ত্রণার ছাপ। কিছুদিন আগে কর্মস্থলে বৈদ্যুতিক খুটি থেকে পড়ে তার ডান পায়ের হাড় ভেঙে যায়। এতে বড় একটি অপারেশনের সম্মুখীন হতে হয় তাকে। এরপর থেকেই ব্যথাটা যেন থমকে আছে পায়ের ভাঙা স্থানে। ডাক্তার তাকে বললেন, “একটা ট্যাবলেট দিচ্ছি। ব্যথা অনেকটাই কমে যাবে আশা করি।” ট্যাবলেটটির নাম ‘ট্যাপেন্টাডল’।
প্রথম দিনেই ওষুধটি জাদুর মতো কাজ করলো। যন্ত্রণায় কাতর থাকা জামশেদ হঠাৎ করেই স্বস্তি ফিরে পেলেন। কয়েকদিনের মধ্যেই স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে শুরু করলেন তিনি। পরিবারও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল- ‘ওষুধটা সত্যিই ভালো কাজে লেগেছে’।
কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ নয়, বরং এখান থেকেই শুরু। স্বস্তির আড়ালে কয়েক সপ্তাহ পর রাশেদ বুঝতে পারলেন, শুধু ব্যথা কমানোর জন্য নয়, ওষুধটি না খেলে তার মাঝে অদ্ভুতরকম অস্বস্তি তৈরি হয়। মাথা ঘোরে, মেজাজ খারাপ হয়, ঘুম আসে না। সে বুঝতে পারে এটা শুধুই ব্যথার ওষুধ নয়, এর মধ্যে কিছু একটা আছে যা তাকে আসক্ত করে ফেলছে। জামশেদের জীবনে ‘ট্যাপেন্টাডল’র যাত্রা ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনের মাধ্যমে শুরু হলেও, পরে সে নিজ থেকেই এই ‘পেইনকিলার’ নিতে শুরু করেন।
কিছুদিন পর- ব্যথা নেই বললেই চলে, কিন্তু এই ওষুধ ছাড়া যেন তার শরীর-মন দুটোই ভেঙে পড়ে। সে বুঝল অসহ্য ব্যথা থেকে যে ট্যাবলেট সে গ্রহণ করছিলো তা যেন মাদকের মতো। প্রতিদিনই তার প্রয়োজন হচ্ছে এই নিষিদ্ধ মাদক ‘ট্যাপেন্টাডল’। যা তাকে গোটা পরিবার ও সমাজের কাছ থেকে অনেক দূরে নিয়ে গেছে।
জামশেদের অনুধাবন হয়তো তাকে সুস্থতার পথে নিয়ে আসবে। কিন্তু সবার ক্ষেত্রে সে উপলব্ধিটাই হয় না। আবার হলেও মাদক থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননা। তারা ধীরে ধীরে তলিয়ে যান গভীর অন্ধকারে।
‘ট্যাপেন্টাডল’ শুরুতে ব্যাথানাশক হিসেবে বাজারে আসলেও তা পরিনত হয়েছে প্যাথেড্রিন, মরফিন বা ট্রামাডলের মতো মাদকে। ওষুধটি ২০২০ সালে বাংলাদেশ সরকার নিষিদ্ধ করলেও এখনো যত্রতত্র মিলছে এই ‘সাইলেন্ট কিলার’খ্যাত মাদকটি।
এ মাদকটিও অন্যান্য ভয়ংকর মাদকের মতোই প্রতিক্রিয়া তৈরি করে সেবনকারীদের ভেতর। আসক্তির কারণে অনেকেই জড়াচ্ছে চুরি, ছিনতাই, অপহরণ, লুটপাট, ধর্ষণ ও খুনের মতো অপরাধে। দেশে ‘ট্যাপেন্টাডল’ নিষিদ্ধ হলেও, প্রতিবেশী দেশ ভারতে বৈধ হওয়ায় সেখান থেকে এটি পাচার হয়ে আসছে। অনেক মাদকাসক্ত ‘ট্যাপেন্টাডল’র দাম কম হওয়ায় ইয়াবার বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করছেন। জানা যায়, ১০০ মি.গ্রা. একটি ট্যাবলেটের দাম ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেয়া তথ্য থেকে জানা যায়, বছর তিনেক আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সারা দেশে ব্যাপক অভিযানে মাদক ব্যাবসা ঝিমিয়ে পড়েছিল। ওই সময় ইয়াবা হাতের কাছে না পাওয়ায় ‘ট্যাপেন্টাডল’র দিকে ঝুঁকেছিলেন মাদকাসক্তরা।
চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গবেষকদের মতে, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা নিয়ন্ত্রণে বহুল ব্যবহৃত ওষুধ ‘ট্যাপেন্টাডল’ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এটি একদিকে কার্যকর ব্যথানাশক, অন্যদিকে অপব্যবহারের ঝুঁকিও বাড়ছে।
২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অনুমোদন পাওয়ার পর থেকেই ট্যাপেন্টাডল দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। গবেষক ‘উইলিয়াম ই ওয়েড’ ও ‘উইলিয়াম জে স্প্রুইল’ তাদের ২০০৯ সালের গবেষণায় দেখান, ট্যাপেন্টাডল একটি ‘কেন্দ্রীয়ভাবে ক্রিয়াশীল ব্যথানাশক’, যা মাঝারি থেকে তীব্র ব্যথা কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। পরবর্তী সময়ে স্নায়ুবিজ্ঞানী কে.কে. জৈন বলেন, নরএপিনেফ্রিনের (একটি গুরুত্বপূর্ণ নিউরোট্রান্সমিটার এবং হরমোন, যা শরীরের স্ট্রেস বা জরুরি পরিস্থিতিতে রক্তচাপ ও হৃৎস্পন্দন বাড়াতে কাজ করে) পুনঃশোষণ বন্ধ করে। এর ফলে জটিল ব্যথায় এটি কার্যকর হতে পারে।
২০২৩ সালে সৌদি আরবের গবেষক ফাহাদ এস. আলশেহরি বলেন, প্রচলিত ওপিওয়েডের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং স্নায়বিক ব্যথায় বিশেষভাবে কার্যকর। ইউরোপভিত্তিক গবেষণায়ও একই ধরনের ফলাফল পাওয়া গেছে।
রিপোর্টার্স২৪/ফয়সাল