আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য আহ্বান উপেক্ষা করে ইরানে নতুন করে হামলা চালিয়ে শান্তি আলোচনায় নিজেদের স্বার্থ ও অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করেছে বেঞ্জয়িাম নেতাহুর নেতৃত্বাধীন ইসরায়েল। বিশ্লেষক ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান আলোচনায় এতদিন কার্যত বাইরে রাখা হলেও, সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ইসরায়েল একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছে,তাদের স্বার্থ উপেক্ষা করে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা সম্ভব নয়।
এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর প্রথমবারের মতো সোমবার ইরানে হামলা চালায় ইসরায়েল। এর আগে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে বলে দাবি করে তেহরান। পরে ট্রাম্প উভয় পক্ষকে সংঘর্ষ বন্ধের আহ্বান জানালে সোমবারই দুই দেশ পাল্টাপাল্টি হামলা স্থগিত করে, যদিও ভবিষ্যতে পুনরায় সংঘাত শুরুর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়নি কেউ।
ড্যানি অরবাচ বলেন, ইসরায়েল ওয়াশিংটনকে জানিয়ে দিতে চেয়েছে যে, তাদের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থকে উপেক্ষা করা হলে তারা পুরো আলোচনাকেই ভেস্তে দিতে সক্ষম।
ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর থেকে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এসব আলোচনায় ইসরায়েলকে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। একই সঙ্গে ট্রাম্প বারবার নেতানিয়াহুকে এমন কোনো পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকতে বলেছেন, যা আলোচনা ব্যাহত করতে পারে। মার্চে লেবাননে অভিযান শুরু করার পরও তিনি সংযমের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
ইরান জানিয়েছে, লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর না থাকলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো শান্তিচুক্তিতে সম্মত হবে না। গত সপ্তাহে ট্রাম্পের সঙ্গে টেলিফোন আলাপের পর নেতানিয়াহু বৈরুতে পরিকল্পিত বিমান হামলা বাতিল করেছিলেন। পরে ট্রাম্প স্বীকার করেন, উত্তপ্ত আলোচনায় তিনি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে ‘অত্যন্ত বেপরোয়া’ বলে অভিহিত করেছিলেন, যদিও দুজনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালো বলেও উল্লেখ করেন।
দেশটির অভ্যন্তরে সমালোচকরা অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনাকে টিকিয়ে রাখতে গিয়ে নেতানিয়াহু কার্যত ইসরায়েলের সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা সীমিত করেছেন, অথচ আলোচনায় তাদের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই।
রয়টার্সকে এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জানান, লেবাননে হামলার জবাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপকে বৈধ প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে দিতে চায়নি ইসরায়েল। তাই তারা সরাসরি ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত নেয়।
হামলার আগে নেতানিয়াহু দেশের শীর্ষ নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে সম্ভাব্য স্বল্পমেয়াদি উত্তেজনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। কর্মকর্তাদের মতে, একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কোনো চুক্তি হলেও যেন দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান চালানো এবং সেখানে সেনা মোতায়েন রাখার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের স্বাধীনতা সীমিত না হয়।
এ বিষয়ে নেতানিয়াহু সপ্তাহান্তে ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বলে জানান ওই কর্মকর্তা।
সোমবার রাতে যুদ্ধবিরতির পর দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় নেতানিয়াহু বলেন, ইরান আবার হামলা চালালে ইসরায়েল কঠোর জবাব দেবে। একই সঙ্গে তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে নিজের ‘ভালো সম্পর্ক’-এর কথাও উল্লেখ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া ইসরায়েল ইরানে হামলা চালাতে সক্ষম হলেও দীর্ঘ সময় ধরে এককভাবে এমন সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
ইয়োশুয়া কালিস্কি বলেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে এই যুদ্ধ একা চালিয়ে যাওয়া ইসরায়েলের পক্ষে সম্ভব নয়, কারণ গোলাবারুদ সীমাহীন নয়।’
সাম্প্রতিক এই সংঘাত আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে ইরান প্রশ্নে মতপার্থক্য কতটা গভীর হয়েছে। ব্যক্তিগত পর্যায়েও নেতানিয়াহু স্বীকার করেছেন যে, ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তার খুবই সীমিত। রয়টার্স
রিপোর্টার্স২৪/এসসি