| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

ভারত জোর করে মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠাচ্ছে, অভিযোগ এইচআরডব্লিউর

reporter
  • আপডেট টাইম: জুন ১৭, ২০২৬ ইং | ১৯:১৩:৪১:অপরাহ্ন  |  ৩৪৯৮ বার পঠিত
ভারত জোর করে মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠাচ্ছে, অভিযোগ এইচআরডব্লিউর
ছবির ক্যাপশন: সংগৃহীত

সিনিয়র রিপোর্টার: ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বসবাসরত বহু বাঙালি মুসলিমকে ন্যূনতম আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই জোরপূর্বক বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটি বলেছে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক বা বহিষ্কার করা মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন এবং খাদ্য, পানি, আশ্রয় কিংবা চিকিৎসাসেবা ছাড়া সীমান্তে ফেলে রাখা নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণের শামিল হতে পারে।

মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পরিবারগুলোকে নির্মমভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে অথবা সীমান্তে আটকে রেখে তাদের মৌলিক অধিকার উপেক্ষা করছে। তিনি ভারত সরকারকে অবৈধ বহিষ্কার বন্ধ, যথাযথ আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত, নাগরিকত্ব যাচাইয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সমন্বয় এবং মুসলিমদের প্রতি বৈরিতার অবসানের আহ্বান জানান।

প্রতিবেদনে বিজিবির বরাত দিয়ে বলা হয়, ১ জুন থেকে এখন পর্যন্ত বিএসএফের এমন ২১টি প্রচেষ্টা প্রতিহত করেছে বাংলাদেশ। এসব ঘটনায় শিশুসহ ২০০ জনের বেশি মানুষকে সীমান্তবর্তী জেলাগুলো দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, মার্চের নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতির আওতায় শত শত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে আটক করা হয়েছে এবং প্রায় পাঁচ হাজার মানুষকে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।

এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, তারা নয়জন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলেছে। তাঁদের বর্ণনা অনুযায়ী, বিএসএফ সদস্যরা রাতে দলবদ্ধভাবে মানুষকে সীমান্তে এনে কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। অনেক সময় বিজিবি বাধা দিলে ভারতীয় বাহিনী আবার তাঁদের ফিরিয়ে নেয়।

৫ জুন পঞ্চগড়ে শিশুসহ ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টাকে কেন্দ্র করে ৭৫ ঘণ্টার অচলাবস্থা তৈরি হয়। স্থানীয় বাসিন্দা রুবেল হোসেন এইচআরডব্লিউকে জানান, ওই ব্যক্তিরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রায় ৫০ ফুট পর্যন্ত ঢুকে পড়েছিলেন। খবর পেয়ে বিজিবি ঘটনাস্থলে গেলে তাঁরা পিছু হটে নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান নেন।

রুবেল হোসেন বলেন, প্রথম রাতে বজ্রপাত ও ভারী বৃষ্টির মধ্যে খোলা আকাশের নিচে থাকতে হয়েছিল তাঁদের। দ্বিতীয় দিনে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা কিছু শুকনা খাবার দেয়। তাঁর ভাষায়, “আমি যা দেখেছি, তা ছিল যুদ্ধের মতো এক অচলাবস্থা। দুই পক্ষের বিপুলসংখ্যক সদস্য সেখানে মোতায়েন ছিল।”

তিনি আরও জানান, স্থানীয় পর্যায়ে একাধিকবার আলোচনার চেষ্টা হলেও কোনো সমাধান হয়নি। পরে বিএসএফ দলটিকে আবার ভারতের ভেতরে নিয়ে যায়।

৬ জুন ভোরে দুটি বাঙালি মুসলিম পরিবারের ছয় সদস্যকে তেঁতুলবাড়িয়া সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বিজিবি তাদের প্রবেশে বাধা দিলে বিএসএফও তাঁদের ভারতে ফিরতে দেয়নি। ফলে পরিবারগুলোকে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে হয়। পরদিন তাঁদের ভারতে ফিরে যেতে দেওয়া হয়।

এ ছাড়া ৮ জুন ঠাকুরগাঁও সীমান্তে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা নো-ম্যানস ল্যান্ডে আটকে থাকার পর এক গর্ভবতী নারীসহ ১১ জনকে ভারতের দিকে ফিরিয়ে নেয় বিএসএফ।

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) মাধ্যমে ৯০ লাখের বেশি নাম বাদ পড়েছে। এতে বহু মানুষের মধ্যে আটক ও বহিষ্কারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সংস্থাটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, ২০১৯ সালে আসামে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের বিতর্কিত প্রক্রিয়ার ফলে ১৯ লাখের বেশি মানুষ রাষ্ট্রহীনতার ঝুঁকিতে পড়েছিলেন। এরপর হাজার হাজার বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে আটককেন্দ্রে রাখা হয় এবং অনেককে অবৈধভাবে বহিষ্কারের অভিযোগ ওঠে।

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সম্প্রতি বলেছেন, কথিত অবৈধ বাংলাদেশিদের সীমান্তের কাছে নিয়ে গিয়ে সেখান থেকে সরাসরি সীমান্ত পার করে দেওয়া হয়। তাঁর এই বক্তব্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পঞ্চগড়ের বাসিন্দা হাসিবুল ইসলাম জানান, পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির একটি পরিবারের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। পরিবারটির সদস্যদের আধার কার্ড ছিল, তবে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার পর পুলিশ তাদের আটক করে বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করে। পরে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তিন দিন সীমান্তে আটকে থাকার পর শেষ পর্যন্ত তাঁদের ভারতে ফিরে যেতে দেওয়া হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন অস্থায়ী আটককেন্দ্রে শত শত কথিত অনিয়মিত বাংলাদেশি অভিবাসীকে রাখা হয়েছে। তাঁদের অধিকাংশ মুসলিম হলেও কিছু হিন্দুও রয়েছেন।

ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি অবৈধভাবে ভারতে অবস্থান করছেন এবং তাঁদের স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তবে এইচআরডব্লিউ বলেছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তনে সহায়তা করা যেতে পারে, কিন্তু কাউকে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো গ্রহণযোগ্য নয়।

সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া কয়েকজনের অভিযোগ, তাঁদের পরিচয়পত্র, অর্থ ও ব্যক্তিগত সামগ্রী কেড়ে নেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এক ভারতীয় অধিকারকর্মীর বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, সীমান্তবর্তী আটককেন্দ্রগুলোতে প্রায় ৪০০ ব্যক্তি আটক আছেন। তাঁদের অনেককে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার পর আটক করা হয়েছে। এতে মানুষের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশও জানিয়েছে, আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া কাউকে সীমান্ত দিয়ে ঠেলে পাঠানো হলে তা গ্রহণ করা হবে না। ঢাকার অবস্থান হলো, প্রত্যাবাসনের আগে যথাযথ পরিচয় যাচাই এবং বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

এইচআরডব্লিউ বলেছে, আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ এবং জাতিগত বৈষম্য বিলোপবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ অনুযায়ী ভারত সবার অধিকার রক্ষা করতে বাধ্য। একই সঙ্গে জাতি, বর্ণ, বংশপরিচয় বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত না করার দায়িত্বও ভারতের।

সংস্থাটি আরও বলেছে, শিশুদের সীমান্তে আটকে রাখা বা বহিষ্কার করা জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের পরিপন্থী। এই সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্রগুলো শিশুদের জাতীয়তা নিশ্চিত করতে এবং অন্যায়ভাবে তাদের স্বাধীনতা হরণ না করতে বাধ্য।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নাগরিকত্ব যাচাই ও নিয়মতান্ত্রিক প্রত্যাবাসনের জন্য দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় অনেক মানুষ দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মুখোমুখি অবস্থানের মধ্যে আটকে পড়ছেন এবং তাঁদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, “জাতীয়তা যাই হোক না কেন, কোনো মানুষকে দুই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাঝখানে খোলা মাঠে রাত কাটাতে বাধ্য করা উচিত নয়।”

তিনি আরও বলেন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনার কারণে যেন আর কখনো মানুষের মৌলিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন না হয়, তা নিশ্চিত করতে ভারত ও বাংলাদেশ—উভয় দেশের সরকারেরই দায়িত্ব রয়েছে। সূত্র: প্রথম আলো


রিপোর্টার্স২৪/এসসি

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪