| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

বাইশে শ্রাবণ: ক্ষুধা, কবিতা, মৃত্যু এবং মানুষের অন্ধকার মনস্তত্ত্বের অনিবার্য ভাষ্য

reporter
  • আপডেট টাইম: Jul ১৯, ২০২৬ ইং | ০৫:৫৭:০২:পূর্বাহ্ন  |  ২৮৫৮ বার পঠিত
বাইশে শ্রাবণ: ক্ষুধা, কবিতা, মৃত্যু এবং মানুষের অন্ধকার মনস্তত্ত্বের অনিবার্য ভাষ্য

টলিউড নির্মাতা সৃজিত মুখার্জির পরিচালনায় একটি কালজয়ী সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার বাংলা সিনেমা ‘বাইশে শ্রাবণ’। ২০১১ সালে মুক্তিপাওয়া এ সিনেমায় অভিনয় করেছেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, আবির মুখার্জি, গৌতম ঘোষ, রাইমা সেন প্রমুখ। কালজয়ী এ চলচ্চিত্রটি নিয়ে পর্যালোচনা করেছেন ‘বাংলা ট্রুথ’-এর সম্পাদক তাওহীদাহ্ রহমান নূভ। তার পর্যালোচনাটি পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো।


কিছু চলচ্চিত্র কেবল একটি গল্প বলে না; তারা দর্শকের ভেতরে এমন এক অস্বস্তি রেখে যায়, যা সিনেমা শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘদিন ধরে চিন্তার মধ্যে বেঁচে থাকে। সৃজিত মুখার্জির বাইশে শ্রাবণ (২০১১) তেমনই এক চলচ্চিত্র। এটি শুধু একটি সিরিয়াল কিলারের অনুসন্ধান নয়; বরং সভ্যতার পাতলা আবরণ ছিঁড়ে মানুষের ভেতরে জমে থাকা ক্ষুধা, অপমান, ব্যর্থতা, নিঃসঙ্গতা এবং নৈরাজ্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

প্রথম দর্শনে এটি একটি ক্রাইম থ্রিলার। কিন্তু একটু গভীরে নামলেই বোঝা যায়, এটি মূলত মানুষের মনস্তত্ত্ব, অস্তিত্বের সংকট এবং ভাষাহীন যন্ত্রণার চলচ্চিত্র।

কলকাতার বুকে একের পর এক খুন। প্রতিটি লাশের পাশে পড়ে থাকে কবিতার কয়েকটি পঙ্‌ক্তি। পুলিশ তদন্ত এগোয়, সন্দেহভাজন বদলায়, সূত্র জট পাকায়। কিন্তু প্রকৃত রহস্যটি খুনির পরিচয়ে নয়—বরং কেন একজন মানুষ এমন হয়ে ওঠে, সেই প্রশ্নে। এখানেই বাইশে শ্রাবণ সাধারণ থ্রিলারের গণ্ডি ছাড়িয়ে মনস্তাত্ত্বিক সাহিত্যের অঞ্চলে প্রবেশ করে।

চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে বড় শক্তি এর পরিবেশ নির্মাণ। এখানে কলকাতা কোনো শহর নয়, বরং এক বিষণ্ণ মানসিক ভূগোল। প্রতিটি গলি, প্রতিটি বৃষ্টিভেজা রাস্তা, প্রতিটি নীরবতা যেন মানুষের অবচেতন মনের প্রতিচ্ছবি। আলো-অন্ধকারের ব্যবহার এমনভাবে নির্মিত হয়েছে যে, দর্শক কখনোই পুরো সত্য দেখতে পায় না; যেমন মানুষও কখনো নিজের সম্পূর্ণ সত্যকে চিনতে পারে না।

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের প্রবীর রায়চৌধুরী চরিত্রটি বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জটিল চরিত্রগুলোর একটি। তিনি একই সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রতিনিধি, ন্যায়বিচারের সৈনিক এবং নিজের ভেতরে বহন করা এক গভীর শূন্যতার মানুষ। তাঁর চোখে ক্লান্তি আছে, অহংকার আছে, অপরাধবোধ আছে—কিন্তু সবচেয়ে বেশি আছে এমন এক নৈরাশ্য, যা দীর্ঘদিন মানুষের অন্ধকার দেখার পর জন্মায়। তিনি বুঝে গেছেন, আইন অপরাধকে থামাতে পারে, কিন্তু মানুষের ভেতরের শূন্যতাকে নয়।

অন্যদিকে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের অভিজিৎ পাকড়াশি আধুনিক মানুষের প্রতীক। কর্মজীবনের চাপ, ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভাঙন, ভালোবাসা ও দায়িত্বের দ্বন্দ্ব—সব মিলিয়ে সে এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা সবকিছু বুঝেও কিছুই ধরে রাখতে পারে না।

চলচ্চিত্রে কবিতার ব্যবহার নিছক নান্দনিকতার জন্য নয়। এখানে কবিতা একটি সাংকেতিক ভাষা। প্রতিটি উদ্ধৃতি যেন হত্যার চেয়েও বড় কোনো ক্ষতের দিকে ইঙ্গিত করে। জীবনানন্দ, রবীন্দ্রনাথ কিংবা অন্য কবিদের উপস্থিতি এই চলচ্চিত্রে সাহিত্যের অলংকার নয়; বরং মানুষের নিঃসঙ্গতার অভিধান।

অনেকেই চলচ্চিত্রটির সঙ্গে হাংরি আন্দোলনের সম্পর্ক টেনে দেখেন। বাস্তবিক অর্থে সিনেমায় ব্যবহৃত কিছু উপাদান ঐতিহাসিক হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায় না। তবুও এর অন্তর্নিহিত দর্শন আশ্চর্যভাবে সেই আন্দোলনের আত্মাকে স্পর্শ করে। হাংরি জেনারেশনের কবিরা ভাষার বিরুদ্ধে, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে, ভদ্রতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। তাঁদের কাছে সভ্যতা ছিল এক সাজানো মুখোশ, যার নিচে লুকিয়ে আছে আদিম ক্ষুধা।

বাইশে শ্রাবণও যেন একই কথা বলে—মানুষ প্রথমে সভ্য হয় না, প্রথমে ক্ষুধার্ত হয়। সেই ক্ষুধা শুধু খাদ্যের নয়; স্বীকৃতির, ভালোবাসার, অস্তিত্বের এবং স্মরণীয় হয়ে থাকার ক্ষুধা। এই ক্ষুধাই কখনো কবিতা লেখায়, কখনো বিপ্লব ঘটায়, আবার কখনো হত্যাকাণ্ডের জন্ম দেয়।

চলচ্চিত্রটির ভেতরে এক ধরনের নিহিলিজম ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। এখানে ন্যায় ও অন্যায়ের সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে যায়। রাষ্ট্র অপরাধ দমন করে, কিন্তু মানুষের অর্থহীনতাকে থামাতে পারে না। প্রেম মানুষকে বাঁচায় না; বরং আরও অসহায় করে তোলে। সত্য উদ্‌ঘাটিত হলেও কোনো মুক্তি আসে না। যেন পুরো পৃথিবীটাই এমন এক মঞ্চ, যেখানে প্রত্যেকে নিজের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি অভিনয় করছে।

এই অস্তিত্ববাদী শূন্যতাই সিনেমাটিকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে যায়। এখানে মৃত্যু কেবল দেহের সমাপ্তি নয়; বরং বহু আগেই ভেতরে ভেতরে মৃত হয়ে যাওয়া মানুষের শেষ ঘোষণা।

চলচ্চিত্রটির আরেকটি বড় শক্তি হলো—এটি দর্শককে খুনিকে খুঁজতে ব্যস্ত রাখে, অথচ শেষ পর্যন্ত বুঝিয়ে দেয় আমরা ভুল প্রশ্ন করছিলাম। প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল, একজন মানুষ কেন এমন হয়ে ওঠে? সমাজ কি কেবল অপরাধ সৃষ্টি হওয়ার পর বিচার করে, নাকি তার আগের দীর্ঘ অপমান, প্রত্যাখ্যান ও নিঃসঙ্গতাকেও কোনোদিন দেখতে শেখে?

সুর, আবহসংগীত, বৃষ্টিস্নাত চিত্রগ্রহণ এবং সংলাপ চলচ্চিত্রটিকে এক বিষণ্ণ সৌন্দর্য দিয়েছে। বিশেষ করে প্রবীর রায়ের সেই বিখ্যাত সংলাপ—

"জীবনে ভাত-ডাল আর বিরিয়ানির তফাৎটা বুঝতে শেখো। প্রথমটা necessity, দ্বিতীয়টা luxury."

এই সংলাপ কেবল সম্পর্কের কথা বলে না; মানুষের চাওয়া-পাওয়ার নির্মম বাস্তবতাও তুলে ধরে।

বাইশে শ্রাবণ এমন একটি চলচ্চিত্র, যেখানে অপরাধ তদন্তের চেয়ে মানুষের মনস্তত্ত্ব অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ; যেখানে কবিতা প্রমাণের চেয়ে সত্যকে বেশি প্রকাশ করে; যেখানে ভালোবাসা মুক্তি দেয় না, বরং আরও ভঙ্গুর করে; যেখানে সভ্যতার মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকে ক্ষুধা, নৈরাশ্য এবং অস্তিত্বের অনিবার্য শূন্যতা।

সৃজিত মুখার্জি এখানে একটি থ্রিলার নির্মাণ করেননি; তিনি মানুষের অবচেতন মনের একটি অন্ধকার করিডর খুলে দিয়েছেন। সেই করিডরে হাঁটতে হাঁটতে আমরা আবিষ্কার করি—সবচেয়ে ভয়ংকর সিরিয়াল কিলার হয়তো কোনো ব্যক্তি নয়; বরং মানুষের ভেতরে প্রতিদিন জমতে থাকা অপমান, একাকীত্ব, ব্যর্থতা এবং অর্থহীনতার অনুভূতি।

বাইশে শ্রাবণ তাই কেবল একটি চলচ্চিত্র নয়; এটি সভ্যতার বিরুদ্ধে লেখা এক বিষণ্ণ কবিতা, যেখানে প্রতিটি হত্যাকাণ্ড আসলে মানুষের ভেতরে ধীরে ধীরে মৃত হয়ে যাওয়া বিবেকের আরেকটি স্তবক।

রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪