| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

বন্ধ মিলে ১০০ টন গম বরাদ্দ, নরসিংদীতে তোলপাড়

reporter
  • আপডেট টাইম: অগাস্ট ১৭, ২০২৬ ইং | ১২:৪৬:৫১:অপরাহ্ন  |  ৮৮২ বার পঠিত
বন্ধ মিলে ১০০ টন গম বরাদ্দ, নরসিংদীতে তোলপাড়

নরসিংদী প্রতিনিধি: নরসিংদীতে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা একটি ফ্লাওয়ার মিলের নামে ১০০ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বরাদ্দ দেওয়া গমের পুরোটাই পেষাই করে সরকারি গুদামে আটা সরবরাহ করা হয়েছে বলে খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দাবি করলেও, সরেজমিনে ওই মিলে গিয়ে দেখা গেছে সেখানে দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন বন্ধ এবং বিদ্যুৎ সংযোগও নেই। এ ঘটনায় নরসিংদী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, নরসিংদী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছালেহ উদ্দিনসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা এবং মিল মালিকের যোগসাজশে বন্ধ মিলের নামে গম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিজেদের দায় অস্বীকার করেছেন।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, নরসিংদী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অধিদপ্তরের অধীনে চারটি ফ্লাওয়ার মিলের মাধ্যমে গম পেষাই করে ফলিত আটা সরকারি গুদামে সরবরাহ করা হয়। মিলগুলো হলো মেসার্স মেরাজ ফ্লাওয়ার মিল, কারারচর, শিবপুর, নরসিংদী; মেসার্স এস আফরিন ফ্লাওয়ার মিল, চৈতনা, শিবপুর, নরসিংদী; মেসার্স রহিমা ফ্লাওয়ার মিল, নিতাইগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ এবং মেসার্স মীম শরৎ ফ্লাওয়ার মিল, নিতাইগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।

এই চারটি মিলের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে নরসিংদী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের গম পেষাই কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মেসার্স মেরাজ ফ্লাওয়ার মিলটি বিগত ঈদুল আজহার আগ থেকেই বন্ধ রয়েছে। পরে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় গত ৭ জুন মিলটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।

অভিযোগ রয়েছে, মিলটি বন্ধ থাকা এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পরও সংশ্লিষ্ট বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে গত ১৩ জুলাই ২০২৬ তারিখে মেসার্স মেরাজ ফ্লাওয়ার মিলের অনুকূলে ১০০ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়।

বরাদ্দের সিডিভি/আইআর/এসএও নম্বর ২৬২৭-০০০৩২৮৫৬৮৪ (ওএমএস) এবং বিলি আদেশ (ডিও) নম্বর ০১০৪৫৩। ডিওটিতে মেসার্স মেরাজ ফ্লাওয়ার মিলের মালিক মো. মিরাজ আলম ভূঁঞা স্বাক্ষর করেন।

বরাদ্দকৃত ১০০ মেট্রিক টন গমের মূল্য প্রায় ১৯ লাখ টাকা বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক, নরসিংদী সদর কর্মকর্তা জান্নাতি ময়নার স্বাক্ষর রয়েছে।

এখানেই প্রশ্ন উঠেছে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের অধীনে আরও তিনটি সচল ফ্লাওয়ার মিল থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা মেসার্স মেরাজ ফ্লাওয়ার মিলের নামে কেন ১০০ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেওয়া হলো?

বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, গত ২৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে মেসার্স মেরাজ ফ্লাওয়ার মিলের অনুকূলে উপ-বরাদ্দকৃত অবশিষ্ট গম অন্য তিনটি মিলে পুনরায় বরাদ্দ দেওয়া হয়।

এ সংক্রান্ত স্মারক নম্বর ১৩.০১.৬৮০০.০০০.০০০.৫৭.০০০৯.২৫.৬২৮ নম্বর চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, মেসার্স মেরাজ ফ্লাওয়ার মিলের অনুকূলে মোট ১৭৬ দশমিক ৬০০ মেট্রিক টন গম উপ-বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ইতোমধ্যে সরকারি গুদাম থেকে ওই মিলের অনুকূলে ১০০ মেট্রিক টন গম সরবরাহ করা হয়েছে এবং তার ফলিত আটা গুদামে জমা দেওয়া হয়েছে।

পরে অবশিষ্ট ৭৬ দশমিক ৬০০ মেট্রিক টন গমের বরাদ্দ বাতিল করে তা অন্য তিনটি মিলে বণ্টন করা হয়।

এ অবস্থায় স্থানীয়দের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের মধ্যেও প্রশ্ন উঠেছে, মে মাস থেকেই যে মিলে উৎপাদন বন্ধ এবং জুন মাসে যার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে, সেই মিলে কীভাবে ১০০ মেট্রিক টন গম পেষাই করা হলো?

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নরসিংদী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছালেহ উদ্দিন বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে কিছু জানেন না।

তিনি বলেন, উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা সবকিছু বলতে পারবেন। আমার কাছে কাগজপত্র নিয়ে আসলে আমি এতে স্বাক্ষর করে দেই। বাকি কাজগুলো উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা করে থাকেন। মেসার্স মেরাজ ফ্লাওয়ার মিলের নামে বরাদ্দ দেওয়া গম কোথায় এবং কীভাবে পেষাই করা হয়েছে, তা তদন্ত করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে বলে জানান তিনি।

মোহাম্মদ ছালেহ উদ্দিন আরও বলেন, মেসার্স মেরাজ ফ্লাওয়ার মিলের নামে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল সেগুলো মিল মালিক কিভাবে এবং কোথায় পেষন করেছেন তা তদন্ত করলে দেখা যাবে। তদন্তে মিল কর্তৃপক্ষ দোষী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা জান্নাতি ময়না জানান, অভিযোগের পর বিষয়টি তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি সরেজমিনে মিলটি পরিদর্শন করে প্রতিবেদনও দিয়েছে।

তিনি বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে মেসার্স মেরাজ ফ্লাওয়ার মিলের বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। ফলে মিলে আটা উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। তবে মিল কর্তৃপক্ষ তাদের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়টি খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়কে অবহিত করেনি।

তবে তার দাবি, মিলের নামে বরাদ্দ করা ১০০ মেট্রিক টন গম পেষাই করে ফলিত আটা সরকারি গুদামে সরবরাহ করা হয়েছে।

জান্নাতি ময়না বলেন, মেসার্স মেরাজ ফ্লাওয়ার মিলের অনুকূলে বরাদ্দ করা অবশিষ্ট ৭৬ দশমিক ৬০০ মেট্রিক টন গমের বরাদ্দ বাতিল করে তা তিনটি মিলে বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে।

তবে এখানেই মূল প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়েছে যে মিলে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই এবং উৎপাদন বন্ধ, সেই মিলে ১০০ মেট্রিক টন গম পেষাই করে কীভাবে সরকারি গুদামে আটা সরবরাহ করা হলো?

অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সরেজমিনে কারারচরে অবস্থিত মেসার্স মেরাজ ফ্লাওয়ার মিলে গিয়ে দেখা যায়, মিলটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। সেখানে কোনো বিদ্যুৎ সংযোগও নেই। উৎপাদন কার্যক্রম চালানোর কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম দেখা যায়নি।

মিল মালিক মো. মিরাজ আলম ভূঁঞা জানান, তার মিলে বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় তিনি অন্য একটি মিল থেকে গম পেষাই করে সরকারি গুদামে জমা দিয়েছেন।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, মেরাজ ফ্লাওয়ার মিলের নামে বরাদ্দ করা গম অন্য মিলের মাধ্যমে পেষাই করা হয়েছে। তবে এভাবে অন্য মিল থেকে গম পেষাই করে সরকারি গুদামে সরবরাহ করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট খাদ্য বিভাগের অনুমোদন ও বিধিবিধান কী ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সংশ্লিষ্ট বিভাগে এক কর্মকর্তা আরেক কর্মকর্তার ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বলছেন, কাগজপত্রে স্বাক্ষর করা ছাড়া বরাদ্দ ও পরবর্তী কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি অবগত নন। অন্যদিকে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা বলছেন, মিলটি বন্ধ থাকলেও বরাদ্দকৃত গম পেষাই করে আটা সরবরাহ করা হয়েছে।

এদিকে সরেজমিনে মিলটি বন্ধ থাকা এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার তথ্য পাওয়ায় ১০০ মেট্রিক টন গম কোথায়, কীভাবে এবং কোন মিলে পেষাই করা হয়েছে—এ প্রশ্নই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় সূত্রগুলোর অভিযোগ, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের কিছু কর্মকর্তা ও মিল মালিকের যোগসাজশে সরকারি গমের এই বরাদ্দ ও পেষাইয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। যদিও অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তাধীন এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

একটি বন্ধ মিলের নামে বিপুল পরিমাণ সরকারি গম বরাদ্দ এবং পরে সেই গম পেষাই করে সরকারি গুদামে আটা সরবরাহের দাবি ঘিরে নরসিংদীর খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।

অভিজ্ঞ মহলের মতে, শুধু কাগজপত্র যাচাই নয়, বরাদ্দকৃত ১০০ মেট্রিক টন গম বাস্তবে কোথা থেকে নেওয়া হয়েছিল, কোন মিলে পেষাই করা হয়েছে, পরিবহন কীভাবে হয়েছে এবং ফলিত আটা কীভাবে সরকারি গুদামে জমা পড়েছে এসব বিষয় খতিয়ে দেখা জরুরি।

একই সঙ্গে মিলটি বন্ধ থাকার পরও কীভাবে তার নামে গম বরাদ্দ হলো এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিষয়টি জানতেন কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নিরপেক্ষ ও সরেজমিন তদন্ত হলে এই ঘটনায় প্রকৃতপক্ষে কারা জড়িত এবং সরকারি গমের বরাদ্দ ও পেষাইয়ের পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট হতে পারে। সরকারি সম্পদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এমন অভিযোগের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেবে এমন প্রত্যাশা করছেন স্থানীয়রা।


রিপোর্টার্স২৪/ঝুম

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪