রিপোর্টার্স ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক :
রাষ্ট্রীয় তহবিলের অপব্যবহারের অভিযোগে শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহেকে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গতকাল শুক্রবার তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় গণ-অভ্যুত্থানের পর গোতাবায়া রাজাপক্ষে ও তাঁর স্ত্রী নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলে বিক্রমাসিংহে শ্রীলঙ্কার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।
পরে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেও ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করেন। তারপর অনুরা কুমারা দিসানায়েক রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।
বিক্রমাসিংহে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তিনি ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির (ইউএনপি) প্রধান, যা দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল।
বিক্রমাসিংহের জীবন ও রাজনৈতিক যাত্রা
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ফার্স্টপোস্টের তথ্য অনুযায়ী, রনিল বিক্রমাসিংহে ১৯৪৯ সালের ২৪ মার্চ কলম্বোতে এক ধনী ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা এসমন্ড বিক্রমাসিংহে ছিলেন একজন প্রখ্যাত আইনজীবী। তার মা নালিনী বিক্রমাসিংহে ছিলেন প্রভাবশালী বিজেওয়ারদেনা পরিবারের সদস্য—যারা লেক হাউস প্রকাশনা গোষ্ঠীর মালিক ছিলেন। তাঁর নানা ডি.আর. বিজেওয়ারদেনা ছিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনপন্থী সংবাদপত্রের মালিক। অন্যদিকে তার দাদা সি.জি. বিক্রমাসিংহে ছিলেন ঔপনিবেশিক সরকারের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ শ্রীলঙ্কান কর্মকর্তা।
রনিল বিক্রমাসিংহে কলম্বো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ছাত্রজীবনেই তিনি ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন এবং ল স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সভাপতি হন। পরে তিনি সিলন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৭২ সালে সিলন ল’ কলেজ থেকে স্নাতক হন। তিনি আইন পেশায় যোগ দেন এবং পরবর্তীতে কলম্বো বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদে শিক্ষকতা শুরু করেন।
তবে রাজনীতি দ্রুতই তাঁকে টেনে আনে। ১৯৭০–এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি কেলানিয়া নির্বাচনী এলাকায় এবং পরে বিগায়ামা নির্বাচনী এলাকায় ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির (ইউএনপি) প্রধান সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন।
সে সময় ইউএনপির ভরাডুবি হয়েছিল সিরিমাভো বন্দরনায়েকের নেতৃত্বাধীন জোটের কাছে। কিন্তু ১৯৭৭ সালে জে.আর. জয়াবর্ধনের নেতৃত্বে দলটি আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে। সেই বছরই বিক্রমাসিংহে সংসদে এমপি হিসেবে প্রবেশ করেন।
গণ-অভ্যুত্থানের পর শ্রীলঙ্কার ক্ষমতা নেওয়া রনিল গ্রেপ্তার গণ-অভ্যুত্থানের পর শ্রীলঙ্কার ক্ষমতা নেওয়া রনিল গ্রেপ্তার
প্রথমে তাঁকে উপ–পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়। পরে তিনি যুব ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী হন। মাত্র ২৮ বছর বয়সে তিনি জয়াবর্ধনে সরকারের সবচেয়ে তরুণ মন্ত্রী ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি শিক্ষা, শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়সহ একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।
প্রেসিডেন্ট রানাসিংহে প্রেমদাসার শাসনামলে শিল্পমন্ত্রী হিসেবে বিক্রমাসিংহে বিশেষভাবে আলোচনায় আসেন। তাঁর নীতির কারণে শ্রীলঙ্কার শেয়ারবাজারে সংস্কার হয় এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ে। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত তিনি সংসদের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯৩ সালের মে মাসে প্রেসিডেন্ট প্রেমদাসার হত্যাকাণ্ডের পর বিক্রমাসিংহে প্রথমবারের মতো শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী হন। এর পর আরও ছয়বার তিনি এই পদে আসীন হন, যদিও কোনো মেয়াদই পূর্ণ করতে পারেননি। ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, কিন্তু সেই বছরের নির্বাচনে ইউএনপি পরাজিত হয়।
১৯৯৪ সালে দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতা হত্যাকাণ্ডে নিহত হওয়ার পর তিনি ইউএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এর পর তিনি প্রায় পাঁচ বছর বিরোধী দলের নেতা ছিলেন। ১৯৯৯ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হলেও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গার কাছে পরাজিত হন। তখন শ্রীলঙ্কা তীব্র গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত ছিল, যার নেতৃত্বে ছিল তামিল টাইগারস (এলটিটিই)।
চন্দ্রিকা ছিলেন প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী এস.ডব্লিউ.আর.ডি. বন্দরনায়েকের মেয়ে এবং বিক্রমাসিংহের শৈশবের বন্ধু। ২০০০ সালে রনিল তাঁর অধীনে জোট সরকারে প্রধানমন্ত্রী হন। পরে অবশ্য তাঁরা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন।
এই সময়ে সরকার এলটিটিইর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি সই করে এবং শান্তি আলোচনা শুরু হয়। তবে দেশে রাজনৈতিকভাবে এটি ভালোভাবে গ্রহণ করা হয়নি। এক সময় চন্দ্রিকা প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও গণমাধ্যম মন্ত্রণালয় নিজের নিয়ন্ত্রণে নিলে দুজনের মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এতে একটি সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি হয়।
২০০৫ সালে রনিল বিক্রমাসিংহে আবারও রাষ্ট্রপতি পদে লড়েন, কিন্তু মাহিন্দ্রা রাজাপক্ষের কাছে অল্প ব্যবধানে হেরে যান। এর পর তিনি আবার বিরোধী দলের নেতা হন এবং আর কখনও রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হননি।
২০১৫ সালে তিনি আবারও প্রধানমন্ত্রী হন। তখন তিনি মাহিন্দ্রা বিরোধী মৈত্রিপালা সিরিসেনার নেতৃত্বাধীন শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টির (এসএলএফপি) সঙ্গে জোট গড়েন। ২০১৫ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত তিনি তিন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
তবে তাঁর সঙ্গে সিরিসেনার সম্পর্ক ছিল টানাপোড়েনপূর্ণ। ২০১৮ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর অর্জুন মাহেন্দ্রার কেলেঙ্কারিকে কেন্দ্র করে প্রায় দুই মাস দুজনের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে। সিরিসেনা এক সময় তাঁকে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে সরানোর চেষ্টা করেন এবং মাহিন্দ্রা রাজাপক্ষকে প্রধানমন্ত্রী বানান। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সিরিসেনার সিদ্ধান্ত বাতিল করে বিক্রমাসিংহেকে পুনর্বহাল করে।
২০১৯ সালে বিক্রমাসিংহের জন্য বড় ধাক্কা আসে। শুধু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেই ইউএনপি হারে না, ২০২০ সালের সংসদ নির্বাচনে দলটি ভেঙে পড়ে। সংসদে দলটি মাত্র একটি আসন পায়, এমনকি বিক্রমাসিংহে নিজেও নিজের আসন রক্ষা করতে পারেননি। অনেকেই তখন মনে করেন, তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ।
কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। ২০২১ সালের জুনে তিনি সংসদে ইউএনপির একমাত্র সাংসদ হিসেবে ফেরেন।
২০২২ সালে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে শ্রীলঙ্কায় ব্যাপক গণআন্দোলন শুরু হয়। জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধের সংকট দেখা দেয়, মুদ্রাস্ফীতি চরমে ওঠে। জনগণের ক্ষোভ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষের পদত্যাগের দাবি ওঠে।
এই অস্থিরতার মধ্যে মাহিন্দ্রা রাজাপক্ষ প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। গোতাবায়া তখন বিক্রমাসিংহেকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য। কিন্তু পরিস্থিতি সহিংস হয়ে উঠলে গোতাবায়া নিজেও দেশ ছেড়ে পালান। ২০২২ সালের জুলাই মাসে বিক্রমসিংহে তখন শ্রীলঙ্কার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হন। পরবর্তীতে সংসদে ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বী দুল্লাস আলাহাপ্পেরুমাকে হারিয়ে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
যেভাবে পতন হলো রনিলের
গণ-অভ্যুত্থানের পর শ্রীলঙ্কাকে স্থিতিশীল করতে আইএমএফ–সমর্থিত সংস্কার, ঋণ পুনর্গঠন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বেসরকারিকরণের নীতি গ্রহণ করেছিলেন বিক্রমসিংহে। কিন্তু এসব নীতির ব্যাপক সমালোচনা হয়। বিক্ষোভকারীদের দমন করে। তাদেরকে ‘ফ্যাসিস্ট’ হিসেবেও আখ্যাইত করেন। এটি তাঁর জনপ্রিয়তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে শ্রীলঙ্কার নির্বাচনে ভরাডুবি হয় রনিল বিক্রমাসিংহেরল। তিনি মাত্র মাত্র ১৭ শতাংশ ভোট পায়। অন্যদিকে মার্কসবাদ–পন্থী জাতীয় জনশক্তির (এনপিপি) প্রার্থী অনুরা কুমারা দিসানায়েকের ৪২ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়লাভ করে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিক্রমসিংহের নেওয়া কঠোর মিতব্যয়ি পদক্ষেপ শ্রীলঙ্কাকে ধ্বংসের মুখ থেকে ফেরালেও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে প্রচণ্ড অসন্তোষ সৃষ্টি করে। তবুও পরাজয়ে তিনি ভদ্রতা বজায় রাখেন। দিসানায়েকেকে উদ্দেশ্য করে এক বিবৃতিতে লিখেছিলেন, মাননীয় প্রেসিডেন্ট, আমি আপনাকে অনেক ভালোবাসা দিয়ে এই প্রিয় সন্তান শ্রীলঙ্কাকে হস্তান্তর করছি, যাকে আমরা দুজনেই খুব ভালোবাসি।
এরপর থেকে বিক্রমসিংহে মূলত জনদৃষ্টির বাইরে ছিলেন।
কিন্তু গতকাল হঠাৎ করেই চমকপ্রদ খবর প্রকাশিত হয়। অভিযোগ উঠেছে যে, বিক্রমাসিংহে সরকারি তহবিলের অপব্যবহার করেছেন, এবং সেই অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার সকালে তিনি আর্থিক অপরাধ তদন্ত বিভাগে (এফসিআইডি) হাজির হয়েছিলেন ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে লন্ডনে তাঁর সফর সম্পর্কিত জবানবন্দি দিতে।
সে সময় তিনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং তাঁর স্ত্রীর একটি ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠানে অংশ নেন। অভিযোগ হচ্ছে, তিনি ব্যক্তিগত কাজে সরকারি সম্পদ ব্যবহার করেছেন। হাভানায় অনুষ্ঠিত জি–৭৭ শীর্ষ সম্মেলন শেষে দেশে ফেরার পথে তিনি লন্ডনে থেমে যান এবং সেখানেই স্ত্রীসহ ইউনিভার্সিটি অব উলভারহ্যাম্পটনের এক অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
তবে বিক্রমাসিংহে দাবি করেছিলেন যে, তাঁর স্ত্রীর ভ্রমণ ব্যয় তিনি নিজেই বহন করেছিলেন এবং কোনো সরকারি অর্থ ব্যবহার হয়নি। তবুও তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে রনিলই এখন শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে প্রথম সাবেক রাষ্ট্রপতি, যিনি গ্রেপ্তার হলেন।
এস