এস এম ফয়েজ:
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি জনগণের অনাস্থা এবং সংস্কারের দাবির মুখে এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের সাধারণ মানুষ এখন একটিই প্রশ্ন করছে— “আমি কি আমার ভোটটি দিতে পারব?” এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশের গতিপথ।
সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রেক্ষাপট
একটি নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার প্রাথমিক শর্ত হলো নির্বাচন কমিশনের পূর্ণ স্বাধীনতা এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা। ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে অন্তর্বর্তীকালীন সংস্কারের পর গঠিত নতুন নির্বাচন কমিশনের ওপর গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। অতীতের নির্বাচনগুলোতে দেখা গেছে, দলীয় প্রভাবের কারণে মাঠ পর্যায়ের প্রশাসন ও পুলিশ অনেক সময় একপাক্ষিক ভূমিকা পালন করেছে। তবে এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে যে আইনি সংস্কার করা হয়েছে, তাতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর কমিশনের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পেয়েছে। নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে এবার প্রশাসনের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ব্যাপক রদবদল করা হয়েছে যাতে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক মহলের অনুগত ব্যক্তিরা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে না পারে।
ভোটাধিকার প্রয়োগ ও জনগণের প্রত্যাশা
গণতন্ত্রের প্রাণ হলো ভোটাধিকার। সাধারণ ভোটারদের মধ্যে গত এক দশকে যে ভোটবিমুখতা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মানুষ চায় এমন একটি পরিবেশ, যেখানে কোনো ভয়ভীতি বা প্রলোভন ছাড়াই তারা ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবে। “আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব”—এই স্লোগানটি যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, তার জন্য এবার স্বচ্ছ ব্যালট বক্স এবং প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে। ভোটারদের আস্থা ফেরাতে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকেও ইতিবাচক ও সহিংসতামুক্ত প্রচারণার প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা: ত্রিস্তরের সুরক্ষা পরিকল্পনা
নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ থাকে সবসময়। বিশেষ করে গ্রামগঞ্জে ভোটের দিন সহিংসতার আশঙ্কা বেশি থাকে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক বিশাল কর্মীবাহিনী মোতায়েনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
প্রথম স্তরে: পুলিশ, আনসার ও গ্রাম পুলিশ কেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
দ্বিতীয় স্তরে: র্যাব ও বিজিবি ভ্রাম্যমাণ দল হিসেবে টহল দেবে।
তৃতীয় স্তরে: জনমনে আস্থা ফেরাতে এবং বড় ধরনের কোনো গোলযোগ ঠেকাতে সেনাবাহিনীকে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে মোতায়েন করার জোরালো দাবি ও পরিকল্পনা রয়েছে।
নির্বাচনী এলাকায় অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং চিহ্নিত অপরাধীদের আগাম গ্রেফতারের মাধ্যমে একটি ভীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। এছাড়া বর্তমান সাইবার সিকিউরিটি আইন ব্যবহার করে নির্বাচনী গুজব ও উস্কানি ছড়ানো বন্ধে কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা
একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন কেবল নির্বাচন কমিশনের একার চেষ্টায় সম্ভব নয়। এর জন্য সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ এবং সহনশীলতা জরুরি। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার যে দাবি দীর্ঘদিনের, তা বাস্তবায়নে সরকার ও কমিশনকে সচেষ্ট হতে হবে। বিরোধী দলগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং তাদের নির্বাচনি কর্মকাণ্ডে বাধা না দেওয়া গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অংশ। রাজনৈতিক সমঝোতা ও সংলাপের মাধ্যমে যদি বড় দলগুলো একই টেবিলে বসে নির্বাচনি আচরণবিধি মেনে চলার শপথ নেয়, তবে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে সংশয় অনেকাংশে কেটে যাবে।
চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা
এতসব প্রস্তুতির মাঝেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। কালো টাকার প্রভাব এবং পেশিশক্তির ব্যবহার বন্ধ করা কঠিন একটি কাজ। অনেক সময় দেখা যায়, দিনের বেলা পরিবেশ শান্ত থাকলেও রাতে ভোটারদের ভয় দেখানো হয়। এই ‘অদৃশ্য ভয়’ দূর করতে হলে কেবল ভোটের দিন নয়, বরং নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই মাঠ পর্যায়ে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। এছাড়া প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং ইভিএম বা স্বচ্ছ ব্যালট নিয়ে জনমনে থাকা বিভ্রান্তি দূর করা নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় পরীক্ষা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য একটি অ্যাসিড টেস্ট বা অগ্নিপরীক্ষা। এই নির্বাচনের মাধ্যমে যদি জনগণ তাদের প্রকৃত প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারে এবং ভোট দেওয়ার অধিকার ফিরে পায়, তবেই দেশের উন্নয়ন টেকসই হবে। দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক এবং সাধারণ মানুষের নজর এখন ২০২৬-এর এই মাহেন্দ্রক্ষণের দিকে। প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে একটি উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের উপহার দিতে।
শেষ পর্যন্ত জয় হোক সাধারণ ভোটারের, জয় হোক গণতন্ত্রের।
লেখক: এস এম ফয়েজ, সিনিয়র সাংবাদিক
[ আমরা মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ও শ্রদ্ধাশীল। এই বিভাগে লেখকের ‘মতামত’ একান্তই তার নিজস্ব; যার দায়ভার রিপোর্টার্স২৪ বহন করে না। ধন্যবাদ ]