সুজিত সজীব :
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের কিংবদন্তি নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের হত্যাকাণ্ড মার্কিন ইতিহাসে দীর্ঘদিন ধরেই একটি অমীমাংসিত ও রহস্যঘেরা অধ্যায়। ১৯৬৮ সালের ৪ এপ্রিল মেমফিসের লরেন মোটেলে তাকে গুলি করে হত্যা করা হলেও, এই হত্যার নেপথ্যে কে বা কারা ছিল—সে প্রশ্ন কখনোই পুরোপুরি থামেনি। বরং সময় যত গড়িয়েছে, প্রশ্ন আরও গভীর হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল আর্কাইভস থেকে উন্মুক্ত হওয়া কয়েক লক্ষ পৃষ্ঠার গোপন নথি এই হত্যাকাণ্ডকে নতুন আলোয় সামনে এনেছে।
মার্কিন আইনে নির্দিষ্ট সময় পর রাষ্ট্রের গোপন নথি প্রকাশের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ন্যাশনাল আর্কাইভস নাগরিক অধিকার আন্দোলন ও মার্টিন লুথার কিং হত্যাকাণ্ড-সংশ্লিষ্ট প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার পৃষ্ঠার নথি জনসমক্ষে আনে। এসব নথির বড় অংশই এফবিআই, সিআইএ এবং স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ও গোপন প্রতিবেদন। এই নথিগুলো প্রকাশের পর মার্কিন রাষ্ট্রযন্ত্রের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
উন্মুক্ত নথিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে এফবিআই-এর তৎকালীন পরিচালক জে. এডগার হুভারের নির্দেশনায় পরিচালিত কার্যক্রম। সেখানে দেখা যায়, ১৯৬৩ সাল থেকেই এফবিআই কিং-কে ‘কমিউনিস্ট’ প্রমাণ করার লক্ষ্যে পরিকল্পিত নজরদারিতে রাখে। তার ব্যক্তিগত জীবন, এমনকি শোবার ঘর পর্যন্ত নজরদারির আওতায় আনা হয়। নথিতে উল্লেখ আছে, কিং-এর চরিত্র হননের জন্য কেলেঙ্কারি ছড়ানোর কৌশল নিয়েও আলোচনা হয়েছিল, যাতে তিনি নাগরিক অধিকার আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন।
এই ধারাবাহিকতার সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর প্রমাণ হিসেবে উঠে এসেছে একটি বেনামী চিঠির তথ্য। এফবিআই-এর পাঠানো ওই চিঠিতে কিং-কে ‘ভণ্ড’ আখ্যা দিয়ে তাকে আত্মহত্যার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। বহু বছর ধরে এই চিঠিকে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বলে উড়িয়ে দেওয়া হলেও, নতুন নথি সেটিকে রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের বাস্তব দলিল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
হত্যাকাণ্ডের দিন, অর্থাৎ ১৯৬৮ সালের ৪ এপ্রিল মেমফিসের লরেন মোটেলে কিং-এর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যে মারাত্মক গাফিলতি ছিল, তা নতুন নথিতে আরও স্পষ্ট হয়েছে। জানা যায়, ঠিক সেই সময়ে তার নিরাপত্তায় নিয়োজিত কৃষ্ণাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তাদের হঠাৎ করেই ডিউটি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। কেন, কার নির্দেশে এবং কী প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল—তা নিয়ে নথিতে পরিষ্কার ব্যাখ্যা নেই। তবে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত স্পষ্ট।
নথিতে আরও উঠে এসেছে, কিং-এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে নজরদারির বিষয়েই বেশি মনোযোগী ছিল। ফলে তিনি কার্যত ছিলেন অরক্ষিত, অথচ সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের মধ্যে।
সরকারি বয়ানে জেমস আর্ল রে-কে একক ঘাতক হিসেবে তুলে ধরা হলেও, নতুন নথিতে তার পলাতক জীবনের আর্থিক দিকটি বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। একজন পলাতক আসামি হয়েও তিনি কীভাবে বিপুল অর্থের জোগান পেলেন, কীভাবে কানাডা হয়ে লন্ডনে পালিয়ে যেতে পারলেন—তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নথিতে নেই। বরং সেখানে ‘ছদ্মবেশী দাতা’ ও অজ্ঞাত সহায়তাকারীদের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
এই ফাইলগুলোর একটি অংশে কিং পরিবারের দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের কথাও উঠে এসেছে। ১৯৯৯ সালে মেমফিসে অনুষ্ঠিত একটি দেওয়ানি মামলায় জুরি রায় দিয়েছিল, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র কোনো একক ব্যক্তির হাতে নয়, বরং একটি বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন। ২০২৫-২০২৬ সালে প্রকাশিত নথিগুলো সেই রায়ের পক্ষে নতুন সূত্র ও প্রমাণ হাজির করেছে।
নতুন নথিতে সিআইএ-এর ‘অপারেশন ক্যাওস’-এর ভূমিকার কথাও সামনে এসেছে। এই অপারেশনের মাধ্যমে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের ভেতরে বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছিল। কিং-এর আন্তর্জাতিক সফর, বিদেশি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিশেষ করে ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী অবস্থান তাকে রাষ্ট্রের চোখে ‘জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি’তে পরিণত করে।
হত্যার পরপরই এফবিআই যেভাবে তদন্তের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়, সেটিও সন্দেহ জাগিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় পুলিশ কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার বাধার মুখে পড়েছিল। বেশ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেছিলেন, গুলিটি লরেন মোটেলের বিপরীত পাশে একটি ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে ছোড়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সাক্ষ্যগুলো তদন্তে গুরুত্ব পায়নি, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে সেগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে নতুন নথিতে উল্লেখ আছে।
এই নথিগুলো নিয়ে বর্তমানে ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা একমত যে, মার্টিন লুথার কিং-কে দমনে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেই সুপরিকল্পিত চাপ ছিল। অনেকের মতে, জেমস আর্ল রে ছিলেন কেবল একটি দাবার ঘুঁটি—যার পেছনে ছিল আরও পেশাদার ও শক্তিশালী শক্তি।
এদিকে এই প্রেক্ষাপটে ‘দ্য কিং সেন্টার’(মার্টিন লুথার কিং-কে নিয়ে গবেষণা ও তার স্মৃতি সংরক্ষণ করে) -এর অবস্থান সরকারি বয়ানের সঙ্গে স্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক। কিং সেন্টারের আর্কাইভ ও নথিপত্র মূলত ১৯৯৯ সালের ঐতিহাসিক দেওয়ানি মামলার রায় এবং বহু বছরের সংগৃহীত সাক্ষ্য ও প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ওই মামলায় ১২ জন জুরি সর্বসম্মতভাবে রায় দেন যে, স্থানীয়, রাজ্য ও ফেডারেল সংস্থার সমন্বয়ে একটি বৃহৎ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল।
লরেন মোটেলের পাশের একটি রেস্তোরাঁর মালিক লয়েড জাওয়ার্সের স্বীকারোক্তি কিং সেন্টারের নথিতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি দাবি করেছিলেন, কিং হত্যার বিনিময়ে তাকে এক লাখ ডলার দেওয়া হয়েছিল এবং প্রকৃত শ্যুটার ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা, যিনি ঝোপের আড়াল থেকে গুলি চালান।
কিং সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, অপারেশন কোইনটেলপ্রোর আওতায় কিং-কে ‘আমেরিকার সবচেয়ে বিপজ্জনক কৃষ্ণাঙ্গ নেতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তার প্রতিটি পদক্ষেপ নজরে রাখা হতো। হত্যাকাণ্ডের আগে পরিকল্পিতভাবে তার নিরাপত্তা বলয় ভেঙে দেওয়া হয়, যা কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ।
কিং সেন্টার জেমস আর্ল রে-কে সরাসরি ‘বলির পাঁঠা’ হিসেবে আখ্যা দেয়। তাদের নথিতে দাবি করা হয়েছে, রে-র কথিত রাইফেল থেকে ছোড়া গুলির সঙ্গে কিং-এর শরীরে পাওয়া বুলেটের নিখুঁত ফরেনসিক মিল পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে তার অস্বাভাবিক আর্থিক সক্ষমতাও গভীর সন্দেহের জন্ম দেয়।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬৭ সালের ৪ এপ্রিল নিউইয়র্কের রিভারসাইড চার্চে ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে কিং-এর ভাষণের পর থেকেই সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাকে আরও বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। কিং সেন্টারের নথিতে এমনকি হত্যার দিন মেমফিসে সামরিক স্নাইপার দলের উপস্থিতির দাবিও রয়েছে।
২০২৫ সালের নথি উন্মোচন কিং সেন্টারের দীর্ঘদিনের দাবিকে আরও শক্ত ভিত দিয়েছে। বহু সাক্ষীর জবানবন্দি, যেগুলো একসময় চাপা দেওয়া হয়েছিল, এখন নতুন করে সামনে আসছে। হোটেলের আশপাশে অবস্থানরত সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সঙ্গে সরকারি সংস্থার সম্পর্কের নতুন তালিকাও গবেষকদের হাতে এসেছে।
কোরিটা স্কট কিং ও তার সন্তানরা আজীবন এই সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছেন যে, এটি কোনো একক ঘাতকের কাজ ছিল না, বরং একটি রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হত্যাকাণ্ড। দ্য কিং সেন্টারের আর্কাইভ সেই লড়াইয়ের জীবন্ত দলিল।
সবশেষে বলা যায়, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের হত্যাকাণ্ড কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং একটি রাষ্ট্র ও তার প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার অস্বস্তিকর ইতিহাস। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে উন্মুক্ত নথিগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—সত্য চাপা দিতে সময় লাগতে পারে, কিন্তু তা চিরকাল গোপন রাখা যায় না।
লেখক : সুজিত সজীব
[ আমরা মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ও শ্রদ্ধাশীল। এই বিভাগে লেখকের ‘মতামত’ একান্তই তার নিজস্ব; যার দায়ভার রিপোর্টার্স২৪ বহন করে না। ধন্যবাদ ]