| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

‘বাচ্চারা বলছিল, আমাদের বাঁচান—তখন আমিও ছিলাম মৃত্যুর অপেক্ষায়’

reporter
  • আপডেট টাইম: Jul ২১, ২০২৬ ইং | ২২:২২:০৮:অপরাহ্ন  |  ৪২৪ বার পঠিত
‘বাচ্চারা বলছিল, আমাদের বাঁচান—তখন আমিও ছিলাম মৃত্যুর অপেক্ষায়’

স্টাফ রিপোর্টার: “একটি ছোট্ট শিশু আমার ওড়নার আঁচল মুখে চেপে ধরে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছিল। চারপাশে শুধু ধোঁয়া, আগুন আর চিৎকার। আমার শিক্ষার্থীরা কাঁদতে কাঁদতে বলছিল—‘মিস, কিছু করেন... আমাদের বাঁচান’। কিন্তু সেই মুহূর্তে আমি নিজেও কতটা অসহায় ছিলাম, তা ভাষায় বোঝানো যাবে না। মনে হচ্ছিল, হয়তো এটাই আমাদের জীবনের শেষ সময়।” কথাগুলো বলতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছিলেন মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষিকা ফারজানা কাবেরী। স্মৃতিগুলো যেন এক বছর পরও তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল সেই বিভীষিকাময় দুপুরে।

মঙ্গলবার (২১ জুলাই) রাজধানীর দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত শোক ও দোয়া অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ফাজানা কাবেরী এসব কথা বলেন।

এই শিক্ষিকা জানান, দুর্ঘটনার কয়েক মিনিট আগেও সবকিছু ছিল একেবারেই স্বাভাবিক। ক্লাস শেষ হলেও কয়েকজন শিক্ষার্থী একটি বিষয় বুঝতে না পারায় তিনি তাদের নিয়ে শ্রেণিকক্ষেই ছিলেন। ঠিক তখনই কো-অর্ডিনেটর মাহেরিন চৌধুরীর সঙ্গে তার শেষ কথা হয়।

ওই দুর্ঘটনায় নিহত শিক্ষক মাহেরিনকে ফারজানা কাবেরী বলেছিলেন, ‘আমি বাচ্চাদের নিয়ে ক্লাসে আছি’। উত্তরে মাহেরিন চৌধুরী বলেছিলেন, ‘আপনি ওদের বুঝিয়ে দিন, আমি স্কাই সেকশনের সামনে আছি।’

কয়েক মুহূর্ত পরই বিকট এক বিস্ফোরণের শব্দ। “প্রথমে আমরা বুঝতেই পারিনি কী হয়েছে। আকাশ থেকে একটি বিমান এভাবে স্কুল ভবনের ওপর ভেঙে পড়তে পারে, এমন কল্পনাও কখনো করিনি। মুহূর্তেই পুরো কক্ষ কেঁপে ওঠে। আমরা মাটিতে পড়ে যাই। চারদিকে ঘন কালো ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে যায়। কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। শুধু শিশুদের কান্না আর চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম”, বলেন শিক্ষিকা ফারজানা কাবেরী।

তিনি জানান, তার সঙ্গে তখন ১৮ জন শিক্ষার্থী ছিল। ধোঁয়ায় শ্বাস নিতে না পেরে সবাই ছটফট করছিল। তিনি এক শিক্ষার্থীকে উঠিয়ে বলেছিলেন, ‘বাবা, সবাই পেছনের দিকে যাও’। কিন্তু সেদিকেও ছিল না নিরাপদ কোনো পথ।

“পেছনের দেয়াল এতটাই কাছে ছিল যে বাতাস ঢোকারও সুযোগ ছিল না। আমার বাচ্চাগুলো শ্বাস নিতে পারছিল না। তখনই দেখি একটি শিশু আমার ওড়নার আঁচল ধরে নিজের মুখে চেপে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছে। সেই দৃশ্য আজও আমাকে তাড়া করে বেড়ায়,” বলেন তিনি।

নিজেও একজন মা, এই অনুভূতিটাই তখন সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছিল বলে জানান ফারজানা কাবেরী। তিনি বলেন, “আমার এতগুলো সন্তান যখন আমাকে বলছে, ‘মিস, আমাদের বাঁচান’, তখন আমি নিজেই মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। তাদের বলতে পারিনি যে, হয়তো আমরাও আর বাঁচব না। তবুও তাদের সাহস দিয়ে যাচ্ছিলাম। বলছিলাম, কিছু একটা হবে। আমরা বের হওয়ার চেষ্টা করব। হয়তো আগুনে পুড়ব, কিন্তু বেঁচে যাব।”

একপর্যায়ে বের হওয়ার পথ খুঁজতে স্কাই সেকশনের গেটের দিকে তাকিয়ে দেখেন, পুরো পথজুড়ে আগুনের দেয়াল। বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই!

“আমি যখন বাচ্চাদের বললাম, এদিক দিয়ে যাওয়া যাবে না, তখন ওরা আতঙ্কিত হয়ে জিজ্ঞেস করছিল—‘মিস, তাহলে কি আমরা আর বাঁচব না?’ ওই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে ছিল না। শুধু বলেছিলাম, ‘দেখি বাবা, আল্লাহ নিশ্চয়ই একটা ব্যবস্থা করবেন’।”

সেই ভয়াবহ মুহূর্তের আরেকটি স্মৃতি এখনো তাকে নাড়িয়ে দেয়। “আমি গেটের কাছে গিয়ে দেখি, আমার পায়ে জুতা নেই। বিস্ফোরণের ধাক্কায় জুতা ছিটকে কোথায় চলে গেছে জানি না। কিন্তু তখন জুতার কথা ভাবারও সময় ছিল না। শুধু একটাই চিন্তা, যেভাবেই হোক, আমার বাচ্চাগুলোকে বাঁচাতে হবে।”

কথা শেষ করতে গিয়ে ফারজানা কাবেরীর কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। তিনি বলেন, “আল্লাহর অশেষ রহমত আর অনেকের সাহসী সহযোগিতায় আমরা সেদিন বেঁচে ফিরেছি। কিন্তু সেই আগুন, সেই ধোঁয়া, সেই ছোট ছোট মুখগুলোর আতঙ্কিত চাহনি—এসব কোনোদিন ভুলতে পারব না। একজন শিক্ষক হিসেবে এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন, সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতি।”

২০২৫ সালের ২১ জুলাই বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের আত্মার মাগফিরাত ও আহতদের আরোগ্য কামনায় ‘সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে মোরা পরের তরে’ স্লোগানে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে এই শোক ও দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪