| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর : প্রত্যাশা বাস্তবায়ন কত দূর!

reporter
  • আপডেট টাইম: Jul ১৯, ২০২৬ ইং | ২০:৫৯:৪৭:অপরাহ্ন  |  ৯২০৪ বার পঠিত
জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর : প্রত্যাশা বাস্তবায়ন কত দূর!

এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া: ২০২৪ সালের ৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ছাত্র জনতার হাজারো প্রাণের বিনিময়ে, রক্তাক্ত করে রাজপথ দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসীবাদী স্বৈরশাসনের অবসান হয়েছিল। সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে শুরু আন্দোলনটিই এসময় ফ্যাসীবাদী শাসকের পতনের লক্ষে ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের সূচনা করে। যা সরকার পতনের মধ্য দিয়ে বিজয়ের ধারার সূচনা হয়েছিল। ৫ আগস্ট বিজয়ের চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। এই ঐতিহাসিক আন্দোলনের মধ্যূ দিয়েই ফ্যাসীবাদী শাসকের প্রধান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুধু পদত্যাগই করেন নাই, পদত্যাগ করে প্রতিবেশী ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এর ফলেই দেশের রাজনীতিতে তৈরি হয় নতুন পরিবেশ। 

ফ্যাসিবাদবিরোধী দলগুলোর প্রকাশ্য বাধাহীন রাজনীতি করার সুযোগ সৃষ্টি হয়।  চলতি বছর জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছরে নানা প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে জনমনে। শহীদেরা বৈষম্যহীন যে মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে রাষ্ট্র জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের উল্টো পথে হাঁটছে। এই সময়কালে শোষণ-বৈষম্য আরও বৃদ্ধি পেয়েছে, বেকারত্ব, চাকরিচ্যুতি, অভাব, দারিদ্র্য আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। 

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রায় দুই বছর পূর্তিতে জনগন জানতে চায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব কতটা মিললো ?  জুলাইয়ের সুফল কার ঘরে কতটা উঠল? ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পর প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব এখনো অমিল। সংস্কার, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিচারের ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হলেও, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও শ্লথ বিচার প্রক্রিয়ায় জনমনে অসন্তোষ ও হতাশা রয়ে গেছে।  জুলাইয়ের মূল চেতনা—'বৈষম্যহীন সমাজ গঠন'। তবে সেই অনুযায়ী দৃশ্যমান কাঠামোগত পরিবর্তন না হওয়ায়, বিশ্লেষকদের মতে, সামগ্রিক বৈষম্য দূর করতে আরও দীর্ঘমেয়াদী ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। তারা মনে করেন, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো না গেলেও অর্জন অনেক। একটি সুনির্দিষ্ট জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা গেলে তা আগামী প্রজন্মের জন্য আরও ভালো হতো। 

স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশবাসীর মনে প্রত্যাশা ছিল, বিগত আওয়ামী শাসনামলে ঘটে যাওয়া সব অন্যায়-অবিচারের অবসান হবে, অবসান ঘটবে দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের, জনগনের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে, সমাজের সকল স্তরের শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে এবং দেশ এগিয়ে যাবে। আর এই সকল অঙ্গীকার নিয়েই ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল দেশের ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। তবে দু বছরে না যেতেই সব প্রত্যাশায় বড় ধরনের হোঁচট খেতে হচ্ছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি একটি জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হলো। জনগনের ভোটে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হলো। গণভোটে সংস্কার বিজয়ী হলো। অথচ তারপরও এবার জনমনে প্রশ্ন উঠেছে- ‘জুলাই চেতনা কি আদৌ পূরণ হলো, নাকি অধরাই রয়ে যাবে ?’  কারণ স্বাভাবিকভাবেই তখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল- পূর্ববর্তী শাসনামলের দুঃশাসন, দুর্নীতি ও বিচারহীনতার অবসান ঘটবে। নতুন সরকার দুর্নীতিমুক্ত, গণতান্ত্রিক এবং সুশাসনভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণে দৃঢ় হবে। 

রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এবং রক্তের পিচ্ছিল পথের উপর দাঁড়িয়ে প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক সরকার জনমানুষের আশা-আকাংখা অনুসারে যে সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে তা বাস্তবায়ন নিয়ে এখানো চলছে নানা তর্ক-বিতর্ক, সেই সংস্কার এখনও বাস্তবরূপ লাভ করেনি, গণভোটের রায়ও বাস্তবায়ন হ্য় নাই। আদৌ বাস্তবায়ন হবে কিনা সন্দেহ রয়েছে। তবে এরই মধ্যে আশার কথা হলো যে, এ সংস্কারের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য  থাকলেও ঐক্য প্রক্রিয়া বা ঐক্য প্রচেষ্টা এখনও অব্যাহত রয়েছে। শেষ পর্যন্ত সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে ছাড় দিয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী হয়ে উঠছেন। জনগন আশা করতে ই পারে সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রতিষ্ঠিত জুলাই সনদ হয়তো বাস্তবায়ন হবে। 

যে কোন গণ-অভ্যুত্থান নিজেই একটি বড় প্রাপ্তি। সেই অর্থে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান আমাদের জন্য অবশ্যই একটি বিশাল প্রাপ্তি। জুলাই অভ্যুত্থানের কারণেই আওয়ামী লীগের মতো একটি ফ্যাসিস্ট শাসকগোষ্ঠীর পতন হলো, তার চেয়ে বড় প্রাপ্তি এ দেশের জনগণের জীবনে খুব কমই আছে। এই অভ্যুত্থানের আগে-পরে দেশে যে বিপুল জনসচেতনতা ও সৃষ্টিশীল গণক্ষমতার উদ্বোধন আমরা দেখেছি, তরুণদের মধ্যে যে স্বচ্ছ রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও দেশ গঠনের দৃঢ় প্রত্যয় জন্ম নিতে দেখেছি, তা এককথায় মহাকাব্যিক।

২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই। এই দুই বছরের হিসাবনিকাশটা এখনো সম্পন্ন করা কি সম্ভব ? ইতিমধ্যে অনেকেই আলোচনা করছেন —কী চেয়ে কী পেলাম। দুই বছর আগে যে গণ-অভ্যুত্থান আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, তা নিছক একটি সাধারণ রাজনৈতিক ঘটনা বলে মনে করলে চলবে না। বরং এটি ছিল একটি সামাজিক বিস্ফোরণ, যেখানে বহুদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, বঞ্চনা, অসন্তোষ একসঙ্গে বিস্ফোরিত হয়েছে। এমন বিস্ফোরণ রাজনৈতিক অঙ্গনে হুটহাট করে ঘটে না, বা প্রতিদিনই ঘটে না। ’২৪-এর অভ্যুত্থান ছিল মূলত ছাত্রদের নেতৃত্বে নানা সামাজিক শক্তির সম্মিলিত উদ্যোগ, যেখানে রাজনৈতিক দল শুধু প্রান্তিক চরিত্রে অবস্থান করেছে। আওয়ামী লীগের দমন-পীড়ন, গুম, খুন ও হিংসাত্মক আচরণ, পুলিশবাহিনীর নৃশংসতা-সবকিছুকে উপেক্ষা করে ছাত্র-জনতা সেদিন যে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল তাকে দমন করা কোনো সরকারের পক্ষেই সম্ভব ছিল না। জুলাই-২৪-এর প্রতিটি দিন রাজপথে ক্ষুব্ধ মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছিল। সর্বস্তরের নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরী অদম্য সাহসিকতায় বুক চিতিয়ে স্লোগান দিচ্ছিল ‘বুকের ভেতর ভীষণ ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর।’ কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী জনগনের ভোটাধিকার পট্রয়োগের মাধ্যমেপ্রতিষ্ঠিত সরকার ও সংসদ প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশে যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা কি সত্যি কোনো গণমুখী রাষ্ট্র গঠনের পথে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে? নাকি আবার পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যেই আমরা ঘুরপাক খাচ্ছি? এই প্রশ্নের উত্তর খুজে পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে ক্রমান্বয়ে। 

জুলাই গণআন্দোলন প্রসঙ্গে আন্দেঅরনে নতৃত্বদানকারী অনেকেই বলেন, ‘আমরা কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতার ডাকে জুলাইয়ে নামিনি। যে অস্ত্র-গুলি জনগণের টাকায় কেনা তা জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার হওয়ার বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছি। আজ রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে সরকার শহিদ ও আহতদের তালিকা করতে না পেরে ও শহিদ পরিবার এবং আহতদের ডেকে তাদের কথা না শুনে নৈতিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। জুলাই ঘোষণাপত্র বাস্তবায়ন ছাড়া এ রাষ্ট্রে জনগণের অধিকার আদায় সম্ভব না। শহীদ পরিবারের সদস্য বলেন, আমাদের কেন সরকারের কাছে গণভোটে বিজয়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন চাইতে হবে? কেন এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইতে হবে? এই সরকার তো ক্ষমতায় বসে আছে শহিদদের রক্তের ওপর। সরকারের উচিত ছিল নিজ দায়িত্বে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও বিচারের ব্যবস্থা করা। 

বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি বলেন, শুধু নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করলেই জুলাই অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা পূরণ হবে না। গণঅভ্যুত্থানের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি এবং জুলাই সনদ চূড়ান্ত করতে হবে। ১৬ বছর ফ্যাসিবাদী সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে সীমাহীন লুটপাট ও দুর্নীতি করেছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে চরম স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা কায়েম করেছে। সমালোচনা ও বিরোধী কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে নিষ্ঠুর দমন-পীড়ন চালিয়েছে। মানুষের ভোটের অধিকার হরণ করেছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ করার পাশাপাশি তারা ইতিহাসকেও অনেকাংশে আত্মসাৎ করেছে, যার দায় দেশবাসীকে বহন করতে হবে বহু বছর। এই সকল কিছুর বিরুদ্ধে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। 

আওয়ামী শাসনামলে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে আমাদের জাতীয় বীর শের-এ- বাংলা এ কে ফজলুল হক, স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়দিী, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানী, সশস্র মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, মাওলানা আবদুর রশিদ র্তবাগীশ, তাজ উদ্দিন আহমেদ এবং সৈয়দ নজরুল ইসলামকে। তাদের বিষয়ে রাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত গ্রহন করতে হবে। রাষ্ট্রীয় মর্যদায় তাদের সকলকে অধিষ্ঠিত করতে হবে। আমাদের জাতির দুর্ভাগ্য, আমাদের দেশে ক্ষমতার বদলের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু বদলে যায়। কেবল চেয়ার নয়, রাষ্ট্রের নীতিকৌশলও। কিন্তু এসব কতটা জনগণের কল্যাণে আর কতটা ভিন্ন কারণে, সেটা ভেবে দেখার বিষয়। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত সংবিধানে ১৭টি সংশোধনী আনা হয়েছে, যার বেশির ভাগই দলীয় ও ব্যক্তিস্বার্থে।

আমাদের ইতিহাস কিন্তু শুধু ৫২ থেকে শুরু হয়ে যায়নি, আমাদের ইতিহাসের দীর্ঘ লড়াই আছে। ব্রিটিশবিরোধী লড়াই আছে, সাতচল্লিশের লড়াই আছে এই ভূখণ্ডের মানুষের, একাত্তরের রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আছে, নব্বই আছে, চব্বিশ আছে। ইতিহাসের বাকে বাকে অনেকেরই অনেক অবদান রয়েছে। অনেক ফাউন্ডিং ফাদারস রয়েছেন, যাঁদের অবদানের ফলে এই ভূখণ্ড, এই রাষ্ট্র, আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। ফলে আমরা এটিকে একটি দলে, একজন ব্যক্তিতে সীমাবদ্ধ করতে চাওয়া সঠিক হবে না। 

জুলাই আন্দোলনের অবশ্যই ব্যর্থতা রয়েছে। বড় ব্যর্থতা হচ্ছে এই যে জনগণের অংশগ্রহণমূলক একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, বাস্তবে তা রূপ দেয়া সম্ভব হয় নাই, সে সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। অভ্যুত্থান একটি প্রবল রাজনৈতিক ঝড়ের মতো এসে, রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর জমে থাকা আগের ভোগদখলকারীদের ইমারতকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছে। কিন্তু সেই ফাঁকা জায়গায় গণমানুষের প্রতিনিধিত্বমূলক কাঠামো না গড়ে, পুরোনো ধারাতেই চুনকাম শুরু হয়েছে। আর এর পেছনে রয়েছে একধরনের হিসাবি রাজনীতি। আন্দোলনের চালিকাশক্তি ও জীবন দেয়া ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক, মফস্বলের মানুষগুলো এখন সবচেয়ে উপেক্ষিত। দুই বছরেও সামাজিক শক্তিগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। বরং নির্বাচনের পূর্বে জাতীয় সরকারের কথা বলা হলেও নির্বাচনের পর সরকার গঠনে একটি পরিষ্কার ‘পিক অ্যান্ড চুজ’ নীতি কাজ করেছে। এর মানে হলো, সরকার নিজেই ঠিক করেছে কারা গ্রহণযোগ্য এবং কারা নয়। যার ফলে সত্যিকারের কোনো সামাজিক দাবিদারেরা জায়গা পাননি, বরং কিছু সুবিধাভোগী গোষ্ঠী বা নমনীয় ‘সুশীল’ ব্যক্তিরা জায়গা পেয়েছেন।

সরকার পরিবর্তন হলেও কিছু বড় ব্যবসায়ী ও লুটেরা গোষ্টির প্রতিনিধিরা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে গোপনে সমঝোতা করে ব্যবসা পরিচালনা করে যাচ্ছে। তাদের লুন্ঠন বন্ধ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। তারা এখনো সমভাবেই পূর্বেরমত রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছে। বড় বড় কিছু বিজনেসম্যান আছে, তাদের সঙ্গে যেই রাজনৈতিক দলই আসুক না কেন, সেই রাজনৈতিক দলের একটা সুন্দর নেগোসিয়েশন হয়ে যায়। সেই বিজনেসম্যানরা ধীরে ধীরে বিজনেস মাফিয়া হয়ে উঠতে শুরু করে। তাদের কিছু মিডিয়া হাউস থাকে, তারা মিডিয়া মাফিয়া হয়ে ওঠে। এরপর তাদের কিছু ব্যাংক হয়, ধীরে ধীরে তারা ব্যাংক মাফিয়া হয়ে ওঠে। অল্প কিছু মানুষের কম্বিনেশনে একটা মাফিয়াদের এম্পায়ার (রাজত্ব) হয়, সেই মাফিয়াদের এম্পায়ারে বিভিন্ন ব্যবসায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রবেশের দরজাটা বন্ধ করে রাখা হয়। ফলে বহু অর্জনই আর জনগনের হৃদয় সম্পর্শ করতে পারে না। জুলাইয়ের অর্জনও কি তাহলে ছিনতাই হয়ে যাবে সেরকমভাবেই ? আবু সাঈদ, মুগ্ধসহ জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগ কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা কোটারী স্বার্থে ব্যবহৃত হতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মতো জুলাই গণঅভ্যুত্থানকেও কেউ কেউ বাণিজ্যে পরিণত করার চেষ্টা করছে। জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলাগুলোর তদন্তের ধীরগতি উদ্বেগজনক। ৮৭ শতাংশ মামলার এখনো তদন্ত ও অভিযোগপত্র দাখিল হয়নি। বর্তমান গতিতে চললে এসব মামলার তদন্ত শেষ করতে কয়েক দশক লেগে যেতে পারে, যা বিচারপ্রার্থীদের জন্য অবিচারের শামিল।

জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান একটি প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও বহুত্ববাদী বাংলাদেশ গঠনের সুযোগ তৈরী করেছে। হিংসা, বিভাজন, মব সংস্কৃতি, সাম্প্রদায়িকতা কিংবা জঙ্গিবাদী তৎপরতার মাধ্যমে সেই অর্জন নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও দেশ ও জনগণের স্বার্থে সব গণতান্ত্রিক শক্তির বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার এখনই সময়। সরকার তাদের কিছু রাজনৈতিক অর্জন বিরোধীদের হাতে তুলে দিচ্ছে কি না—সে প্রশ্নও উত্থাপিত হচ্ছে নানা মহল থেকে। বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা না হলে তাঁদের আত্মত্যাগের লক্ষ্য পূরণ হবে না। শহীদরা কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থে জীবন দেননি। তাঁদের আদর্শ ও চেতনাকে সামনে রেখেই দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।

মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রকে এবার জনগণের হাতে ফিরিয়ে না দিলে ইতিহাস আবার সাক্ষ্য দেবে—গণ-অভ্যুত্থানে সরকারের পরিবর্তন হলেও পরিবর্তিত ব্যবস্থায় গণমানুষের জায়গা তৈরি হয়নি। এখনই সময়, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারের ভেতরে গণ-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর। এখনই সময় সামাজিক শক্তিগুলোকে সংগঠিতভাবে রাজনৈতিক কাঠামোয় যুক্ত করার। সুযোগ কিন্তু বারবার আসে না। যদি এবারের সুযোগ জাতির হাত ছাড়া হয়ে যায় তাহলে ভবিষ্যতে জনগনের আকাঙ্খা পূরণ করা কঠিন থেকে কঠিনতর হতে বাধ্য। মনে রাখতে হবে, জুলাই ২৪ এ যদি আন্দোলনকারীরা হেরে যেত তাহলে হেরে যেত বাংলাদেশ। জুলাইয়ের আত্মত্যাগ অনেক বড় একটা ঘটনা। এই ঘটনার ওপর ভর করে যারা আজ বিভিন্ন ফায়দা লুটে নিচ্ছেন, জেনে রাখবেন আপনাদের স্থান আস্তাকুঁড়ে ছাড়া অন্য কোথাও নয়, ইতিহাস আপনাদের ক্ষমা করবে না। আমরা চাই, আমাদের এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যার যেটুকু অবদান, সেটুকুর যথাযথ মূল্যায়ন হোক। কারও অবমূল্যায়ন কিংবা অতি মূল্যায়ন দেশ ও জনগণের জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না।

লেখক : কলাম লেখক, রাজনীতিক কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক [E-mail : gmbhuiyan@gmail.com}

রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪