স্টাফ রিপোর্টার: জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত তিন হাজার ২৪১ জন জুলাইযোদ্ধার পুনর্বাসনের জন্য তথ্যভান্ডার তৈরি করেছে সরকার। তবে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৫০ জনের জীবিকার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছে। সরকারের দাবি, আহতদের চিকিৎসা, মাসিক ভাতা, এককালীন অনুদান ও বিদেশে উন্নত চিকিৎসাসহ বিভিন্ন খাতে এ পর্যন্ত প্রায় ৯৭৩ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। তবে আহতদের অভিযোগ, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার জন্য পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জুলাইযোদ্ধাদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে তিন হাজার ২৪১ জনের ডেটাবেজ তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে এক হাজার ৯৩৭ জনের তালিকা প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের জন্য যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্যে দেখা যায়, প্রায় ছয় হাজার ৪০০ জনকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলেও কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন মাত্র ১৫০টি পরিবার।
গত বছরের ১৮ জুন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহতদের কল্যাণে পৃথক অধিদপ্তর গঠনের জন্য অধ্যাদেশ জারি করা হয়। পরে ১০ নভেম্বর পুনর্বাসন কার্যক্রমের নির্দেশনা মাঠপর্যায়ে পাঠানো হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তা বাস্তবায়ন হয়নি। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ১০ এপ্রিল জুলাইযোদ্ধা পুনর্বাসন অধ্যাদেশ সংসদে পাস হয়।
বিভিন্ন হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় চার হাজার আহত ব্যক্তি নিয়মিত ফলোআপ চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে প্রায় আড়াই হাজারকে নিয়মিত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসতে হয়। অন্তত দুই হাজার ব্যক্তি স্থায়ীভাবে অঙ্গ বা কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো ১৫৪ জনের মধ্যে এখনও ৩৯ জন থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। দেশে ফিরে আসাদের মধ্যে ২৫ জন এখনো শয্যাশায়ী এবং সাতজন সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসা নিচ্ছেন।
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কামাল আকবর বলেন, দুই হাজারের বেশি আহত ব্যক্তি আর স্বাভাবিক কর্মজীবনে ফিরতে পারবেন না। তাই চিকিৎসার পাশাপাশি পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান এবং মানসিক ট্রমা মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। তিনি জানান, ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট প্রতিষ্ঠিত ফাউন্ডেশন এ পর্যন্ত ৮৩১টি শহীদ পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা করে সহায়তা দিয়েছে। এছাড়া আহত ছয় হাজার ১২৭ জনকে বিভিন্ন ক্যাটেগরিতে ১১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার জরুরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গুরুতর আহত ও দৃষ্টিশক্তি হারানো ব্যক্তিদের চিকিৎসায় গত অর্থবছরে তিন কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এখন একটি বিশেষ ট্রমা হিলিং সেন্টার, দূরবর্তী রোগীদের আবাসন, অ্যাম্বুলেন্স সুবিধা এবং অস্ত্রোপচার ও ওষুধের জন্য পৃথক তহবিল গঠন প্রয়োজন।
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (পঙ্গু হাসপাতাল) পরিচালক ডা. মো. আবুল কেনান বলেন, গুরুতর আহতদের অনেকের শরীরে বসানো স্ক্রু ও রিং অপসারণের চিকিৎসা চলছে। অনেকের ক্ষেত্রে বারবার কৃত্রিম অঙ্গ পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে, বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের জন্য এটি দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা।
জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. যাকিয়া সুলতানা নীলা জানান, চোখে ছররা গুলিতে আহত প্রায় এক হাজার রোগীর চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ১১ জন দুই চোখের এবং ৪৯৩ জন এক চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। এছাড়া ৭৫ জনের আংশিক দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংক্রমণের ঝুঁকি থাকায় তাদের নিয়মিত ফলোআপ প্রয়োজন।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জুলাই গণঅভ্যুত্থান শাখার উপসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, আহতদের চিকিৎসা, মাসিক ভাতা, এককালীন অনুদান ও বিদেশে চিকিৎসাসহ বিভিন্ন খাতে এ পর্যন্ত ৯৭৩ কোটি ৩৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে বিদেশে চিকিৎসায় ব্যয় হয়েছে ৩০০ কোটির বেশি। বর্তমানে ১৪ হাজার ৩৭০ জন আহত ব্যক্তি মাসিক ভাতা পাচ্ছেন। এর মধ্যে ৯৯০ জন 'ক', এক হাজার ৪১৭ জন 'খ' এবং ১১ হাজার ৯৬৩ জন 'গ' ক্যাটেগরিতে রয়েছেন।
এদিকে সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান জানিয়েছেন, পুনর্বাসনের জন্য প্রস্তুত করা ডেটাবেজের আওতাভুক্তদের দ্রুত প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে।
রিপোর্টার্স২৪/বাবি